অন্যদৃষ্টি
ফিলিস্তিনিদের জীবন রক্ষার দায়
দ্য গার্ডিয়ান সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
শুক্রবার ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার সতর্ক করে বলেছেন, গাজার ‘যুদ্ধবিরতি’ একটি ‘নিষ্ঠুর ও মারাত্মক বিভ্রম’। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ২৬৫ শিশুসহ এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। তার মানে, প্রতিদিন একজন খুন হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে গাজার হত্যাকাণ্ড ও ব্যাপক মানবিক সংকট চাপা পড়ে গেছে। এতে দখলকৃত পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা থেকে মনোযোগ সরে গেছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সামরিক প্রধান এবং নিরাপত্তা পরিষেবা-প্রধানদের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ‘ইহুদি সন্ত্রাস নির্মূলে কিছুই না করা’র জন্য অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট তাঁর দেশকে ‘একটি সংগঠিত, পরিকল্পিত, রাষ্ট্র-অর্থায়িত জাতিগত নির্মূল অভিযান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ’ চালানোর জন্য অভিযুক্ত করেছেন, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী দখলদারদের সহিংসতায় সাহায্য করছে। এদিকে বর্তমান ইসরায়েলি সেনাপ্রধান সৈন্যদের এমন কথাও বলেছেন বলে খবর বেরিয়েছে, ‘১৯৬৭ সালের পর আমরা কখনোই এমন হত্যাকাণ্ড চালাইনি।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের একটি প্রতিবেদন আরেকটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করছে। এতে বলা হয়েছে, এই আগ্রাসন মূলত পশ্চিম তীরের অর্থনীতি পতনের দিকে ঠেলে দেওয়ার এক নিরলস অভিযান। এটি শুধু ব্যক্তি ও পরিবারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না। একটি কার্যকর অর্থনীতি ছাড়া কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘যে কোনো ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনিদের জন্য অর্থনীতি অপরিহার্য। অন্যথায় স্থায়ী দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না।’
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী এবং কট্টর ডানপন্থি দখলদারদের সমর্থক দলের প্রধান বেজালেল স্মোট্রিচ বলেছেন, তিনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাটি কবর দিতে চান এবং সেখানকার ‘অর্থনীতি অবসানের’ প্রতিজ্ঞা করেছেন।
১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীরের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ চলছে। ফলে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও কার্যকর অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এই হস্তক্ষেপ নাটকীয়ভাবে আরও কঠোর হয়। ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনি অর্থনীতির প্রকৃত জিডিপি ১৭.৮ বিলিয়ন থেকে ১৩.৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। পশ্চিম তীর ও ইসরায়েলে প্রায় ৩ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের চাকরি হারিয়েছেন।
বাড়িঘর ভাঙা ও জলপাই গাছ উপড়ে ফেলার দৃশ্য চোখে পড়ছে। পর্দার আড়ালের ক্ষতি আরও গভীর। পশ্চিম তীরে চলাচলের ওপর আগে থেকেই আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ আরও কড়াকড়ি করায় কৃষি, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত। এতে অর্থনীতির ভয়াবহ অবনতি হয়। এখন হাতেগোনা কিছু ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়, যদিও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মনে করে, কাজের অনুমতিপত্র পুনর্বহাল করা হলে ইসরায়েলে আরও নিরাপত্তা বাড়তে পারে।
ইসরায়েল সংগৃহীত শুল্ক-রাজস্ব আটকে রাখায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ পঙ্গু হয়ে পড়েছে। যার ফলে গত জুন মাসে তারা কর্মচারীদের মাত্র অর্ধেক বেতন পরিশোধ করেছে। ফিলিস্তিনি অর্থনীতি দুটি ইসরায়েলি ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করার ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। এই সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে থাকা দায়মুক্তি ও ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত পত্রগুলোর ওপর বারবার হুমকির কারণে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও সংযত হতে বাধ্য হয়েছে।
সহিংসতার মধ্য দিয়ে দখলদার বাহিনী এবং তাদের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অপর্যাপ্ত। তবুও যুক্তরাজ্য অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা বা অন্য কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। সংসদ সদস্যরা সংগত কারণেই আরও পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। ফিলিস্তিনিদের জীবন ও জীবিকা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।
সম্পাদকীয়: দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
