১৪ কোটি টাকা ব্যয়েও মিলছে না বিশুদ্ধ পানি
জামালপুর পৌর শহরের বগাবাইদ এলাকায় নির্মিত পানি শোধনাগার সমকাল
আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
পৌরবাসীর বিশুদ্ধ পানির সংকট দূর করার লক্ষ্যে নির্মিত পানি শোধনাগার পরিণত হয়েছে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রতীকে। নির্মাণের পাঁচ বছর পার হলেও চালু হয়নি জামালপুরের দুটি আয়রন রিমুভাল প্ল্যান্ট (আইআরপি)। ফলে ১৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প থেকে আজও এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছেন না পৌরবাসী।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পৌরবাসীর জন্য আয়রনমুক্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে বগাবাইদ এলাকায় একটি প্রকল্প নেয় জামালপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় ছয় লাখ ৮০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ওভারহেড ট্যাংক, সাড়ে তিন লাখ লিটার ধারণক্ষমতার পানি শোধনাগার ও ৪০ কিলোমিটার এলাকায় পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় স্থাপন করা হয় পাঁচটি গভীর নলকূপ। এই প্রকল্পে ব্যয় হয় আট কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
প্রকল্পের কাজ কয়েকটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হয়। তিন কোটি চার লাখ টাকা ব্যয়ে ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণ করে গোপালগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শরীফ অ্যান্ড সন্স। আর সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি শোধনাগার কেন্দ্র ও পাইপলাইন নির্মাণ করে একই এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মনির ট্রেডার্স। ২০১৯ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু করে ২০২১ সালে এপ্রিল মাসে কেন্দ্রটি পৌর কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, পৌর শহরের বগাবাইদ বোর্ডঘর এলাকায় নির্মিত বিশাল আকৃতির পানির ট্যাংক ও শোধনাগার ভবন তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় কেন্দ্রের যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে। প্রকল্প এলাকার পাইপলাইন ফেটে ও ভেঙে পানি সরবরাহের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ– নিম্নমানের কাজ, ত্রুটিপূর্ণ পাইপলাইন ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী এবং ঠিকাদারদের দুর্নীতির কারণেই প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
জামালপুর পৌরসভার প্রকৌশল শাখার তথ্যমতে, প্রকল্পের আওতায় পৌর শহরের রশীদপুর, রামনগর, বগাবাইদ, যুগিরগোপা, চন্দ্রা, ছুটগড়, পলাশগড়, মনিরাজপুর, শেখেরভিটা, কম্পপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। এসব এলাকার ১০ হাজারের মতো পরিবারকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল।
প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী পানি শোধনাগার স্থাপনের পর অন্তত ছয় মাস জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনার কথা। এই সময়ে ত্রুটি ধরা পড়লে ঠিকাদার দিয়ে সমাধানের বিধান রয়েছে। অন্যথায় ঠিকাদারের জামানতের টাকা দিয়ে তা সংশোধন করতে হবে। কিন্তু ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে আঁতাত করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামানতের টাকা ফেরত দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জামালপুর পৌরসভার প্রকৌশল শাখা থেকে জানা গেছে, প্ল্যান্টটি ২০২১ সালের এপ্রিলে উদ্বোধন করেন সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজম। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পানির চাপে ফেটে যায় নিম্নমানের পাইপলাইন। পরে সমস্যা সমাধানের জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পৌর কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পাইপলাইন মেরামত ও প্রকল্পটি সচল করার জন্য বারবার চিঠি দেওয়া হলেও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে কয়েক কোটি টাকার প্রকল্পটি অচল অবস্থায় রয়েছে।
রামনগর এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমানের ভাষ্য, শুকনো মৌসুমে পানির জন্য এলাকায় হাহাকার অবস্থা বিরাজ করে। সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি জনস্বার্থে চালু করা জরুরি।
জামালপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল হকের ভাষ্য, আগের সব পাইপলাইন অকেজো হয়ে গেছে। তাই প্ল্যান্টটি চালু করতে হলে পুরো এলাকায় ফের নতুন পাইপলাইন বসাতে হবে। বিষয়টি নিয়ে পৌর পরিষদের সভায় আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পটি চালু করার লক্ষ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চাওয়া হবে।
একই চিত্র মেলান্দহ পৌরসভায়ও। সেখানে আয়রন রিমুভাল প্ল্যান্ট ও পাইপলাইন স্থাপনে ব্যয় হয় পাঁচ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ২০২০ সালে কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০২১ সালের জুন মাসে। কাজটি বাস্তবায়ন করে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবিএম-এমএমসি জেভি।
মেলান্দহ পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রকল্পের আওতায় এক লাখ ৮০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়। প্ল্যান্টটি বুঝে পাওয়ার পর পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পাইপলাইনের কাজ নিম্নমানের হওয়ায় ও পানি প্রবাহের গতি কম থাকায় গ্রাহক পর্যায়ে পানি পৌঁছানো যায়নি। ফলে বাধ্য হয়েই প্ল্যান্টটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মেলান্দহ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোয়াক্ষির হোসেন জানান, পাইপলাইনে সমস্যা ও পানি প্রবাহের গতি এতটাই কম যে গ্রাহকের নির্ধারিত স্থানে পৌঁছায় না। বিষয়টি সমাধানের জন্য বিভাগীয় কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হলেও প্রতিকার মেলেনি। ফলে বাধ্য হয়েই বন্ধ রাখতে হয়েছে পানি সরবরাহ কার্যক্রম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাব ঠিকাদার হিসাবে দুটি পৌরসভার পানি শোধন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করেন তৎকালীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর আশীর্বাদপুষ্ট স্থানীয় ঠিকাদার জাকির হোসেন জুয়েল ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েক নেতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে তারা সবাই এলাকা ছাড়া।
এসব ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলার জন্য কল দিয়ে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। অফিসে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন তারা।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিমের ভাষ্য, দীর্ঘ পাঁচ বছরেও যদি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চালু না হয়, তাহলে এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, সরকারি অর্থেরও অপচয়। প্রকল্প অচল থাকার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে জামালপুর জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু এসব প্রকল্পের বিষয়ে সদুত্তর না দিয়ে জুন ক্লোজিংয়ের অজুহাত দেখিয়ে কোনো কিছু জানতে চাইলে লিখিত আবেদন করতে বলেন তিনি।
স্থানীয় সরকার উপপরিচালক ও জামালপুর পৌরসভার প্রশাসক মৌসুমী খানমের ভাষ্য, বিষয়টি সমাধানের জন্য শুধু পৌর পরিষদেই নয়, গত রোববার জামালপুর জেলার সমন্বয় কমিটির সভাতেও বিস্তর আলোচনা হয়েছে। জেলা প্রশাসক বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিগগিরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হবে।
- বিষয় :
- পানি
