চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ
মুচলেকায় ছাড়া পেলেও এমপিপুত্রের বিরুদ্ধে তদন্ত চলবে: ডিবি
খাইরুল ইসলাম সজীব
সমকাল প্রতিবেদক, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৯:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিলেও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে ও যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা খাইরুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্ত করবে পুলিশ। প্রায় আট ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ গত রোববার রাত দেড়টায় মুচলেকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেয়।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আইনের চোখে সবাই সমান। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে বিভিন্ন রকম অভিযোগ ছিল। সে জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতে পুলিশ তাঁকে নিয়ে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তাঁর কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মুচলেকায় ছাড়া পেলেও সজীবের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে, তার তদন্ত চালিয়ে যাবে পুলিশ। সজীব কী মুচলেকা দিয়েছেন, তা বলতে চাননি শফিকুল ইসলাম।
গত রোববার দুপুরে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে ঢাকার ডিবির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিবি পুলিশ সজীবকে হেফজতে নেয়। প্রথমে তাঁকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সন্ধ্যায় ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, একটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে সজীবের বিরুদ্ধে। ওই গ্রুপের বিভিন্ন কারখানার কয়েক কোটি টাকা মূল্যের পুরোনো মালপত্রও বিনামূল্যে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানোর পর সজীবকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন বলেন, সজীবকে আটকের পর নারায়ণগঞ্জের মানুষ ভেবেছিল, সরকার হয়তো কঠোর হতে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁকে ছেড়ে দেওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠছে। তিনি বলেন, আগে ওসমান পরিবার নিজেদের নারায়ণগঞ্জের রাজা আর তাদের ছেলেরা নিজেদের রাজপুত্র ভাবত। গণঅভ্যুত্থানের পরে মানুষ ভেবেছিল, এ অবস্থার অবসান হবে। কিন্তু সোনারগাঁসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলবাজির অভিযোগ প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। সোনারগাঁর এমপির ছেলেকে আটকের পরে নারায়ণগঞ্জের মানুষ সরকারকে সাধুবাদ দিয়েছে। কিন্তু তিনি ছাড়া পেয়ে গেছেন।
আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সজীব
উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য না হলেও বাবার প্রভাবে প্রতিটি সভাতেই সজীব উপস্থিত থাকেন এবং নানা বিষয়ে বক্তব্য দেন। এতে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছেন।
জানতে চাইলে সোনারগাঁর ইউএনও আসিফ আল জিনাত বলেন, ‘আমাদের উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি এখনও পুরো গঠিত হয়নি। তাই বাইরের কেউ কেউ এখানে উপস্থিত থাকে। সে হিসেবে এমপি সাহেবের ছেলেও উপস্থিত থাকে।’
তবে এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নান সমকালকে বলেন, ‘উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে আমার ছেলে যায় উপজেলা বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে। দলের প্রতিনিধি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে পাঁচজন যেতে পারে। সে তালিকায় তার নাম সবার আগে।’
এলাকায় নানা অভিযোগ
খাইরুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধে এমপি বাবার প্রভাব খাটিয়ে সোনারগাঁর বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ রয়েছে। ২ মে সজীবের সহযোগী সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সদস্য আলী নূর, পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল জলিল সোনারগাঁয়ের আষাঢ়িয়ার চর এলাকার আল মোস্তফা গ্রুপের প্রধান গেটের সামনে বেড়া দিয়ে জায়গা নিজেদের দাবি করে রাস্তা বন্ধ করে দেন। পরে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি সুরাহা হয়।
এ ছাড়া মেঘনা নদীতে বালুবাহী বাল্কহেড ও কার্গো জাহাজ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে সজীবের বিরুদ্ধে। চাঁদাবাজির অভিযোগে পুলিশ ২০২৫ সালের ২৬ জুন তাঁর সহযোগী যুবদল নেতা মো. সোহাগ মিয়া, বিএনপি নেতা আলী নূরসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারও করে।
সোনারগাঁর মেঘনা নদী থেকে ঢাকায় পানি সরবরাহের জন্য পানি শোধনাগার তৈরি হচ্ছে। এখানে ওয়াসা জমি কিনেছে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। কিন্তু এমপিপুত্রের ঘনিষ্ঠজন স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান মামুন মিয়া ও যুবদল নেতা সোহাগ মিয়া এখানকার মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছেন।
সোনারগাঁয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের গাড়ি পার্কিং, নাগরদোলা পরিচালনাসহ শিশুদের বিনোদন কেন্দ্রের শিডিউল বিক্রি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে সজীবের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে খুশি করা ছাড়া কেউ সোনারগাঁর কোনো কাজের টেন্ডারের শিডিউল কিনতে পারেন না।
সজীবের প্রভাবে সোনারগাঁয়ে অর্ধশতাধিক চুন তৈরি ও ঢালাই লোহার কারখানা গড়ে উঠেছে, যেগুলো অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে চলে। অভিযোগ আছে, এসব জায়গায় অভিযান চালাতে বাধা হয়ে দাঁড়ান তিনি। সজীবের পক্ষে তাঁর ফুফাতো ভাই রশিদ ও বিএনপি নেতা নেয়ামত উল্লাহ এসব নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে সজীবকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। তবে এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নান সমকালকে বলেন, ‘আমাদের টাকার অভাব আছে নাকি যে আমরা মানুষের কাছ থেকে চাঁদা নেব।’
ছেলের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করে এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, এগুলো আওয়ামী লীগ আমলে হতো। বর্তমান সরকারের সময় হয় না। এগুলো মিথ্যা প্রচারণা। আল মোস্তফা ফ্যাক্টরির রাস্তা অবরোধ করে টাকা আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, আল মোস্তফা পিরোজপুর ইউনিয়নের বহু মানুষের জায়গা দখল করে রেখেছে। রাস্তাটি একজনের জায়গা দখল করে করা। স্থানীয় নেতারা বিষয়টি মিটমাট করেছে। এখানে সজীবের কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি বলেন, তাঁর ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সন্ত্রাস নির্মূলে ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, সজীবের আটকের পরে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে ছেড়ে দেওয়ায় চাঁদাবাজরা উৎসাহিত হবে। সরকারকে এ ধরনের লোকদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।
