মেসির রেকর্ড, নকআউটে আর্জেন্টিনা
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৯:২০
অস্ট্রিয়ার রক্ষণকে বোকা বানিয়ে বলটা যখনই জাদুকরি বাঁ পায়ে জালে জড়াল, ঠিক তখনই ডালাসের এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামের ছাদটা যেন স্রেফ উড়ে গেল! পেনাল্টি মিসের সেই আফসোস আর অফসাইডের লাল বাতি– সবকিছু এক লহমায় ধুয়ে-মুছে সাফ। গোলটি করেই লিওনেল মেসি যখন দুহাত প্রসারিত করে সতীর্থদের বুকের মধ্যে পরম আশ্রয়ে নিলেন, ঠিক তখনই মহাজাগতিক মুহূর্তে স্টেডিয়ামের লাউড স্পিকারে ভেসে এলো ডিজের সেই মেঘমন্দ্র, যা স্টেডিয়ামের শব্দমাপক যন্ত্রে অবিশ্বাস্য ১১০ ডেসিবল! শব্দের সেই সুনামি যেন বলছিল– জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের মিথ ভেঙে ১৭ নম্বর রক্তপদ্মটি আজ ফুটে উঠেছে। বিশ্বকাপে সর্বাধিক ১৮ গোল করে অলৌকিক কীর্তির রাজমুকুট মাথায় করে নিয়েছেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দলকে জিতিয়েছেন ২-০ গোলে।
জার্মানির চেনা মাঠ থেকে কাতারের মরুভূমি, আর আজ আমেরিকার এই তপ্ত সবুজ– গেল দুই দশকে প্রতিটি কাঁটা বিছানো পথ পেরিয়ে বিশ্বসংসার তন্নতন্ন করে নিয়ে আসা তাঁর এই ১৮টি গোল, যার পাঁচটি এসেছে গত পাঁচ দিনের মধ্যে! ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসেও যেন একই রকম মায়াবী। এদিন ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজতে না বাজতেই দাপট শুরু আর্জেন্টিনার। অস্ট্রিয়ার ডিফেন্সের স্যান্ডউইচ চ্যালেঞ্জে বক্সে আছড়ে পড়লেন লাউতারো মার্তিনেজ। ভিএআর প্রযুক্তি দেখে রেফারি যখন পেনাল্টির বাঁশি বাজালেন, ডালাসের গ্যালারি তখন ফুটছে; ইতিহাসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আধুনিক ফুটবলের শেষ কাউবয়!
অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগারকে একদম গানপয়েন্টে রেখে স্পটকিক নিতে এগিয়ে এলেন মেসি। একটা চেনা স্টাটার রানআপ। কিন্তু এ কী! শটটা পোস্টে লেগে চলে গেল লাইনের বাইরে! মেসি তখন মাথা চুলকে বাচ্চাদের মতোই সরল আত্মসমর্পণ করেছেন গ্যালারির সামনে। ক্যারিয়ারে তাঁর ৩৩তম পেনাল্টি মিস।
অস্ট্রিয়ার হাই-প্রেসিং ডিফেন্স তখন পেতে রেখেছে অফসাইডের মায়াজাল। প্রথমার্ধের মাঝপথে মেসির একটা দুর্দান্ত দৌড় আর পাসিং মুভ অস্ট্রিয়ান জাল কাঁপালেও লাইন্সম্যানের হাতের পতাকা নিমেষে সব আনন্দ কেড়ে নিল। অফসাইডের লাল বাতি জ্বলে উঠল স্ক্রিনে। পেনাল্টি মিসের পর অফসাইডে গোল বাতিল– যে কোনো সাধারণ ফুটবলারের স্নায়ু ভেঙে যাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি যে মেসি, ৩৮তম মিনিটে অস্ট্রিয়ার রক্ষণদুর্গ চূর্ণ করে ধেয়ে এলেন ফাকুন্দো মেদিনা। তাঁর নিখুঁত পাস খুঁজে নিল থিয়াগো আলমাদাকে। আলমাদার বুদ্ধিদীপ্ত ডামি অস্ট্রিয়ান ডিফেন্সকে বোকা বানাতেই বল চলে এলো বক্সের ঠিক মাথায় ওত পেতে থাকা মেসির জাদুকরি বাঁ পায়ে! এবার আর কোনো ভুল নয়, কোনো অফসাইডের ফাঁদ নয়। চোখের পলকে এক মায়াবী বাঁকানো প্লেসিং শটে বল আছড়ে পড়ল অস্ট্রিয়ার জালে।
কিন্তু কাল যাঁর ৩৯তম জন্মদিন, সেখানে কেকের ওপর চেরি না থাকলে কি হয়! তাই বোধ হয় আরেকটি গোল। ম্যাচ তখন একেবারে শেষ অঙ্কে। ঘড়ির কাঁটায় ৯০ প্লাস ৫ মিনিট, অস্ট্রিয়া মরিয়া হয়ে উঠেছিল সমতা ফেরানোর জন্য। তাদের একটা বিপজ্জনক আক্রমণ তখন আর্জেন্টিনার ডিফেন্সে আছড়ে পড়েছে। কিন্তু অস্ট্রিয়ার সেই মিসড চান্স থেকেই বিদ্যুৎ গতিতে প্রতি আক্রমণে উঠল আলবিসেলেস্তেরা।
বল পায়ে ঝড়ের বেগে ছুটে গেলেন হুলিয়ান আলভারেজ। পুরো স্টেডিয়াম তখন আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। আলভারেজের শটটি যখন নিশ্চিত গোলের দিকে যাচ্ছিল, অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার এক অবিশ্বাস্য সেভে বলটি কোনোমতে রুখে দিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। রিবাউন্ড হয়ে বলটা যখন ছিটকে এলো, সেখানে ওত পেতে ছিলেন এনজো ফার্নান্দেজ। কোনাকুনি আলতো করে বলটা বাড়িয়ে দিলেন বক্সের ভেতর একদম সঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা ফুটবলের পরম ঈশ্বর লিওনেল মেসির দিকে।
মেসি প্রথমবার শট নিতে গেলে অস্ট্রিয়ান ডিফেন্স বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ডন তো ডনই! প্রথম প্রচেষ্টায় না হলেও চোখের পলকে দ্বিতীয়বার রিবাউন্ড বলে আলতো ছোঁয়ায় জাল কাঁপিয়ে দিলেন জাদুকর। ম্যাচ শেষে ভীষণ খুশি দেখিয়েছে তাঁকে। মাঠ ঘুরে গ্যালারির অভিবাদন গ্রহণ করেছেন। গ্যালারির সেদিকটাতে চুমু উড়িয়ে দিয়েছেন, যেখানে তাঁর পরিবারের সবাই ছিল।
- বিষয় :
- লিওনেল মেসি
- আর্জেন্টিনা
- বিশ্বকাপ ফুটবল
