ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

পেলের পরে ইয়ামাল, কিশোর সূর্যের উদয়

পেলের পরে ইয়ামাল, কিশোর সূর্যের উদয়
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৯:২৩

মুখে এখনও কৈশোরের নরম দাড়ি। অথচ ওই সদ্য তরুণ চোখের মণিতেই কিনা ঠিকরে বেরোচ্ছে গোটা বিশ্বকে শাসন করার এক আদিম ও উদ্ধত জেদ। এই তো সেদিনও লা মাসিয়ার ডরমিটরিতে বসে যে ছেলেটি হোমওয়ার্কের খাতা উল্টাত আর পেনসিলের ডগা চিবোতে চিবোতে ভাবত রোববারের ম্যাচে সুযোগ পাওয়া যাবে কি না– সে আজ বিশ্বকাপের ক্যানভাসে পা রেখে বুড়ো বানিয়ে দিচ্ছে দুনিয়ার তাবড় তাবড় ডিফেন্ডারকে। এই ঘোর তো লামিনে ইয়ামালের নিজেরই কাটছে না। ম্যাচের পর তাই মিক্সড জোনে চেনা সাংবাদিকদের সামনে পাড়ার মাঠে আইসক্রিম খাওয়ার সেই নিষ্পাপ শৈশবের হাসি ইয়ামালের, ‘আমার জন্য এটি একটি স্বপ্নের মতো। ২০২২ বিশ্বকাপের সময়ও আমি ক্লাসরুমে বসে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখতাম। আর আজ আমি নিজেই বিশ্বকাপে গোল করছি! পেলের রেকর্ডের পাশে নিজের নাম দেখাটা এক অলৌকিক অনুভূতি।’ তাঁর চোখেমুখে কোনো অহংকার ছিল না; ছিল এক অদ্ভুত সারল্য।

ফুটবল যে কোনো অর্থেই বৃত্তাকার, খোদ ফুটবল-ঈশ্বর বোধ হয় সেখানে নিজের হাতে নতুন চিত্রনাট্য লিখে দিয়েছেন স্প্যানিশ এই তরুণকে নিয়ে। তা না হলে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্টকহোমের সেই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট যুগের মহাকাব্য ওভাবে ২০২৬-এর ডিজিটাল স্ক্রিনে জীবন্ত হয়ে উঠবে কেন? মাত্র ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে যখন ওয়েলসকে স্তব্ধ করে ফুটবল-সম্রাট পেলে বিশ্বকাপের কনিষ্ঠতম গোলদাতা হিসেবে নিজের সাম্রাজ্য গড়েছিলেন, তখন কে জানত– ঠিক ৬৮ বছর পর আষাঢ়ের এক মেঘলা রাতে সেই সিংহাসনের ধুলো ঝেড়ে উঠে বসবেন এক স্প্যানিশ কিশোর! সৌদি আরবের রক্ষণকে ছেলেখেলা বানিয়ে ম্যাচের ঠিক দশম মিনিটে যখন বলটা জালে জড়ালেন, তখন তাঁর বয়স ঠিক ১৮ বছর ৩৪৩ দিন। পেলের পরেই বিশ্বকাপের মঞ্চে দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম স্কোরার! গ্যালারির ৮০ হাজার দর্শক তখন একটা গোল দেখেননি, তারা আসলে দেখলেন ইতিহাসের এক পরম বিশুদ্ধ রাজ্যাভিষেক।

বিশ্বকাপের মহাকাব্যে ইয়ামাল-অধ্যায়ের সূচনাটা যে এভাবে হবে, তা হয়তো খোদ স্প্যানিশ কোচও কল্পনা করতে পারতেন না। ইনজুরির কালো মেঘ কাটিয়ে যখন মাঠে নামলেন, তখন অনেকের মনেই সংশয় ছিল– কিশোর শরীর কি পারবে বিশ্বকাপের এই নির্মম চাপ নিতে? কিন্তু ইয়ামাল তো সাধারণ রক্ত-মাংসের ফুটবলার নন, তিনি লা মাসিয়ার সেই জাদুঘরে তৈরি হওয়া এক বিরল হীরা। ম্যাচের ঠিক দশম মিনিটে যখন বলটা তাঁর পায়ে এলো, তখন সময়ের চাকা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। উইং ধরে ওভাবে ভেতরে ঢুকে আসা, শরীরের একটা মৃদু দোলাচলেই প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেলা। এ হলো এক জাত শিল্পীর ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড়। গোলটা হতেই আটলান্টার আকাশ ভেঙে যেন একটা চিৎকার নামল। পেলের সেই ৬৮ বছর পুরোনো রেকর্ডে ভাগ বসালেন ইয়ামাল। এত বছর ধরে একটা সিংহাসন শূন্য পড়ে ছিল। একটা ধুলো জমা মুকুট অপেক্ষা করছিল এমন কারোর জন্য, যার পায়ে থাকবে ঈশ্বরের বরদান আর বুকে থাকবে এক উদ্ধত কিশোরের স্পর্ধা। ১৯৫৮ সালের স্টকহোমের সেই কালজয়ী কিশোর এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো ওরফে পেলের ঠিক পাশেই চেয়ার টেনে বসে পড়লেন একবিংশ শতাব্দীর এক কিশোর।

যা দেখে ফুটবলবিশ্বও স্তব্ধ। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন কিংবদন্তি ওয়েইন রুনি মুগ্ধ হয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, ‘আমরা সবাই স্পেন দলের পাসিং আর কৌশল নিয়ে কথা বলি, কিন্তু এই মুহূর্তে ইয়ামালই স্পেনের আসল চালিকাশক্তি। ওর খেলা দেখাটা চোখের আরাম।’ অন্যদিকে খোদ স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ম্যাচ শেষে বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘ইয়ামাল ঈশ্বরের এক বিশেষ উপহার। ও যেভাবে এই বয়সে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে, তা ভাবা যায় না।’

স্প্যানিশ ফুটবলে টিকিটাকা যুগের পর যে একটু খরা চলছিল, গতি আর ড্রিবলিংয়ের যে অভাব ছিল, ইয়ামাল একাই তা মিটিয়ে দিচ্ছেন। তিনি মাঠে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে প্যানিক বাটন চেপে বসা। তিনি মাঠে থাকা মানেই ফুটবলের চিরাচরিত ব্যাকরণ ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া। কিশোর বয়সে বিশ্বকাপ শুরু করলেও ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে উঠলে কিন্তু এই ইয়ামাল কিশোর নয়; বছর উনিশের তরুণ হয়েই মাঠে নামবেন। পেলে তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিলেন এই আঠারোর স্পর্ধা দিয়েই। এবার কি তবে ইয়ামাল? পেলের আত্মা স্বর্গ থেকে নিশ্চয়ই মুচকি হেসে হাততালি দিয়েছেন। কারণ, সম্রাটরা কখনও তাদের উত্তরসূরি দেখে ঈর্ষা করেন না; বরং আনন্দ পান।

আরও পড়ুন

×