ঊনচল্লিশের দরজায় চিরনূতন মেসি
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৯:৩১
চুলে এখন আর সেই আগের মতো অবাধ্য ঝাঁকড়া জটলা নেই, সেখানে এসেছে এক পরিপাটি ছাপ। ঘন দাড়িগুলোতে এখন ধূসর আর রুপালি রঙের ছোঁয়া। চোখের কোণেও স্পষ্ট ধরা পড়ে কিছু ক্লান্ত ভাঁজ, যার আড়ালে এখন আর কোনো চঞ্চল কিশোরের ছটফটানি নেই, সেখানে থিতু হয়ে বসে আছে এক পরম শান্ত প্রজ্ঞার আলো– এই তো। চোখে দেখা এতটুকু বদল নিয়েই কাল ঊনচল্লিশে পা রাখছেন ফুটবলের (গোট– গ্রেটেস্ট অব অল টাইম) লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। শুভ জন্মদিন মেসি, ঊনচল্লিশের এই শারীরিক পরিবর্তন আসলে তাঁর জাদুকে ম্লান করেনি; বরং তাঁকে করে তুলেছে আরও বেশি ধ্রুপদি, আরও বেশি মায়াবী।
ফুটবলারদের ক্যারিয়ারে এই বয়সটা তো আসলে গোধূলির আলো। যখন মাঠের সবুজ গালিচা ক্রমে ধূসর হতে থাকে, যখন ট্রেইনিং গ্রাউন্ডের ঘাম জানান দেয়– শরীর আর সায় দিচ্ছে না। কিন্তু মেসি যে ‘ফুটবলের চিরনূতন’। সময়-ঘড়ি আটকে থাকে তাঁর বাঁ পায়ের জাদুতে। আর্জেন্টাইন ফুটবল-সংস্কৃতির একটা নিজস্ব চটক আছে। সেখানে শুধু কেক কাটা হয় না, সেখানে ফুটবলারদের বন্দনা করা হয় ঈশ্বরের মতো করে। ডালাসে কোচ লিওনেল স্কালোনি সংবাদ সম্মেলনে এসে বলেছেন, ‘আমরা শুধু চাই এই বিশেষ দিনে লিও খুশি থাকুক।’ আর থাকবেই না কেন? আলজেরিয়ার বিপক্ষে টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন তিনি।
ডালাসে আসা আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের কাছ থেকে শোনা, জন্মদিনে মেসি তাঁর প্রথম শুভেচ্ছাটি পান স্ত্রী রোকুজ্জোর কাছ থেকে। এরপর দলের সঙ্গে থাকলে ভিডিওকলে কথা বলেন স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে। এবারও হয়তো তেমনটিই করবেন। এর বাইরে প্রিয় মানুষটির জন্মদিনে ড্রেসিংরুমে কোনো রাজকীয় জাঁকজমক নেই; আছে এক পরম ঘরোয়া সারল্য। প্রায় প্রতি জন্মদিনের মতো এবারও মাঝরাতে রদ্রিগো ডি পল আর নিকোলাস ওটামেন্ডিরা কেক আর মোমবাতি হাতে হানা দিতে পারেন অধিনায়কের হোটেল রুমে। সেই চেনা ‘মিষ্টি অত্যাচার’, হাসাহাসি আর জড়িয়ে ধরা।
রাতে টিম হোটেলের রাঁধুনিরা আয়োজন করে থাকেন তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘আসাদো’ বা মাংসের বারবিকিউ উৎসবের, যেখানে গোটা দল মেতে উঠেতে পারে হাসি-গল্পের এক অলস আড্ডায়। বয়স ঊনচল্লিশ, সংখ্যাটা উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতর কেমন একটা বিষাদের মেঘ দানা বাঁধে, একটা চাপা হাহাকার মোচড় দিয়ে ওঠে। সাধারণ ফুটবলাররা এই বয়সে এসে বুটজোড়া তুলে রেখে কোচের আরামদায়ক চেয়ার কিংবা ধারাভাষ্যের এসি বক্স খোঁজেন। শরীর আর সায় দেয় না, ফুসফুস জানান দেয়– আর নয়। কিন্তু যাঁর কথা বলা হচ্ছে, তিনি তো কোনো সাধারণ রক্ত-মাংসের ফুটবলার নন; তিনি রোজারিও থেকে আসা ফুটবল-ঈশ্বরের সেই অবাধ্য বরপুত্র, যাঁর পায়ে বল থাকলে বয়স স্রেফ একটা অর্থহীন সংখ্যার খেরোখাতা হয়ে মুখ লুকিয়ে হাসে।
সেই মেসির বাঁ পায়ের জাদু দেখতে ডালাসের এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচ শুরুর আগে সমর্থকদের স্রোত বয়ে গেছে। গ্যালারির রং হয়ে গিয়েছিল আকাশি-সাদা। এই বিশাল সমর্থকদের সিংহভাগ আর্জেন্টিনার নাগরিক না হয়েও আর্জেন্টাইন। মেসির খেলা দেখতে মাঠে আসেন তারা। গতকাল সোমবার হাজির হয়েছিলেন কিংবদন্তি মেসির পায়ে নতুন রেকর্ড গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। কারণ, রেকর্ড হলেই ৩৯তম জন্মদিনের উপহার পাওয়া হবে মেসির।
- বিষয় :
- লিওনেল মেসি
- আর্জেন্টিনা
- বিশ্বকাপ ফুটবল
