গভীর রাতে সড়কে কার্পেটিং পায়ের চাপে উঠে যাচ্ছে
জয়পুরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দিনের আলোয় নয়, সুনসান রাতের অন্ধকারে তড়িঘড়ি করে চলছে সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণ কাজ। প্রকৌশল বিভাগের তদারকি কর্মকর্তার অনুপস্থিতির সুযোগে কাদা-মাটি ও রাবিশের ওপর যৎসামান্য পিচ ছিটিয়ে চলছে কার্পেটিং। ফলে সকাল হতেই স্থানীয়দের পায়ের সামান্য ধাক্কাতে উঠে যাচ্ছে কোটি টাকার রাস্তার পাথর।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় ‘পুনট-মোসলেমগঞ্জ ভায়া শান্তিনগর’ সড়কের প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার অংশের সংস্কার ও প্রশস্তকরণ কাজে এমনই নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এমন দায়সারা ও নিম্নমানের কাজের কারণে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
অন্ধকারকে পুঁজি করে অনিয়মের মহোৎসব গত বছরের জুন মাসে শান্তিনগর বাজার থেকে মোসলেমগঞ্জ বাজার পর্যন্ত ৭.৩৮ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও একপাশে ৩.৭ মিটার প্রশস্ত করার জন্য দরপত্র আহ্বান করে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর। ৮ কোটি ৩৫ লাখ ১৯৪ টাকা ব্যয়ের এই কাজটি পায় নওগাঁর ‘ইথেন এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার কাজ শুরুই করেন অনেক দেরিতে। আগামী ৩০ জুনের ডেডলাইন বা সময়সীমা ছুঁতে এখন যেনতেনভাবে কাজ শেষ করার ধুম পড়েছে।
গত শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে দশটায় সরেজমিনে ওই সড়কে গিয়ে দেখা যায়, ঘুটঘুটে অন্ধকারে হ্যালোজেন লাইট জ্বালিয়ে পাথর ও পিচ বিছানোর কাজ করছেন ঠিকাদারের লোকজন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দিনের আলোয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর উপস্থিতিতে এই কাজ করার কথা থাকলেও স্পটে উপজেলা প্রকৌশল অফিসের কোনো প্রতিনিধিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজটির শুরু থেকেই অনিয়ম ডালপালা মেলেছে। রাস্তাটি চওড়া করার জন্য একপাশে যে গভীর খনন করা হয়েছে, সেখানে নিয়ম অনুযায়ী বালু ও ভালো ইটের খোয়া দেওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে পুরোনো রাস্তার উপড়ানো পরিত্যক্ত পাথর, ইট ভাঙার গুঁড়া বা রাবিশ এবং মাটি। বর্তমানে পুরো রাস্তায় মাটির আস্তরণ জমে আছে। সেই কাদা-মাটি পরিষ্কার না করেই তাঁর ওপর যৎসামান্য বিটুমিন (পিচ) ছিটিয়ে রাতের আঁধারে কার্পেটিং সিলমোহর করা হচ্ছে।
স্থানীয় থল গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জোব্বার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুরু থেকেই এই রাস্তায় তিন নম্বর নিম্নমানের ইট দিয়ে কাজ চালানো হয়েছে। কাদা-মাটির ওপর নামমাত্র পিচ দিয়ে রাতে কার্পেটিং করা হচ্ছে, যা সকাল হতেই মানুষের পায়ের ঠেলায় উঠে যাচ্ছে। উদয়পুর গ্রামের লাল্টু মিয়া বলেন, সুযোগ বুঝে রাতের বেলায় যা খুশি তাই করছে ঠিকাদারের লোক। এখনই যদি কার্পেটিং উঠে যায়, তবে ছয় মাস পর রাস্তার কী অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়। রাস্তা সংস্কারের নামে মূলত সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট করার পরিকল্পনা করছে ঠিকাদার ও প্রকৌশলী। এলাকাবাসী এই অনিয়মের প্রতিবাদ করলে ঠিকাদারের লোকজন উল্টো তাদের ওপর চড়াও হচ্ছে এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইথেন এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক নুর আলম অদ্ভুত এক যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, এটি কৃষি প্রধান এলাকা এবং বর্তমানে ইরি-বোরো ধান কাটার মৌসুম চলছে। দিনের বেলা কাজ করলে কৃষকদের ক্ষতি ও যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি হবে, তাই তারা রাতে কাজ করছেন। তবে সব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে তিনি বলেন, কাজে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। অন্যদিকে কাজের সাইটে থাকা একাধিক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মালিক বা ম্যানেজার তাদের যেভাবে ও যখন কাজ করতে বলছেন, তারা সেভাবেই করছেন। দিন বা রাত বলে কিছু নেই, ৩০ জুনের মধ্যে দ্রুত কাজ শেষ করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহম্মেদ যেন আকাশ থেকে পড়েছেন। তিনি নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, তিনি নিজে সাইটে থাকেন না। যদি কর্মীরা রাতের বেলায় কার্পেটিংয়ের কাজ করে থাকে, তবে তা অবশ্যই ভুল করেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী (এসও) আবু জাফর সাফ জানিয়ে দেন, রাতে কাজ করার কোনো সুযোগই নেই। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিনে তাঁর অনুপস্থিতিতে এই কাজ করার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি লোকমুখে রাতে কাজ করার খবর পেয়েছেন এবং এই নিম্নমানের কার্পেটিং পুনরায় উঠিয়ে ফেলা হবে বলে আশ্বাস দেন।
পুরো বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, রাতের আঁধারে কার্পেটিং করার বিষয়টি তাঁর কানেও এসেছে। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত কাজ বন্ধ করার এবং প্রয়োজনীয় আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
- বিষয় :
- সড়ক
