ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

আমার শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আমার শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
×

আজফার হোসেন

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

জনগণের মুক্তি প্রসঙ্গই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাজের কেন্দ্রীয় বিষয়। শুধু বিষয় নয়; নিরিখও বটে। জনগণের মুক্তির নিরিখেই তিনি সাহিত্য সমালোচনা করেন; সংস্কৃতিকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেন; সমাজকে বিচার-বিশ্লেষণ করেন, যেমন তা করেন রাজনীতি ও ইতিহাস পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও। তবে ওই প্রশ্ন এখন তোলা জরুরি: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্য জনগণ কারা? সবাই তো জনগণের নামে কথা বলতে চান।  শাসক শ্রেণি জনগণের নামে কথা বলে, ব্যবসায়ীরাও বলেন। এমনকি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও তা বলে থাকে। উদারনৈতিক মানবতাবাদের ঐতিহ্যেও ‘জনগণ’ বা ‘মানুষ’ কথাটা বারবার ফিরে আসে মানবপ্রেমের নামে, যে প্রেম আমরা দেখেছি বিরাজমান অসম ক্ষমতা-সম্পর্ক বা অসম শ্রেণি-লিঙ্গ-বর্ণ-জাতি সম্পর্ককে ধোঁয়াশা করে থাকে। বলা বাহুল্য, এই উদারনৈতিক মানবতাবাদ জনগণের বিপ্লবকে ভয় পায় এবং সে কারণেই তার কোনো সম্ভাবনাকে সে প্রশ্রয় দেয় না। 

ঠিক এই ধারার বিপরীতেই ‘জনগণ’ বা ‘মানুষ’কে ফাঁকা বুলি হিসেবে না নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উদারনৈতিকতাকে শুধু তুমুল সমালোচনা করেন না। বরং জনগণ বা মানুষকে দেখেন বিরাজমান অসম উৎপাদন-সম্পর্ক ও ক্ষমতা-সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, যাতে সাম্যবাদী বিপ্লবী রাজনীতির স্বার্থেই বিরাজমান অসমতাকে চিহ্নিত করে প্রশ্নের মুখে ফেলা যায়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্য ‘জনগণ’ বা ‘মানুষ’ তারাই, যারা বাংলাদেশে ও বিশ্বে অধিকাংশ মানুষ– যারা শোষিত ও নিপীড়িত; যারা পুঁজি ও সাম্রাজ্যের সবচেয়ে নির্মম শিকার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই জনগণ হচ্ছে কৃষক, শ্রমিক, নারী, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এদের পক্ষেই আজীবন লিখেছেন, বলেছেন, লড়াই করেছেন। কেননা, তিনি বুঝে গেছেন এবং বুঝিয়েও দিয়েছেন– এদের মুক্তি ছাড়া মানবতার সার্বিক মুক্তি সম্ভব নয়।
মুক্তির বিষয়টা কেন্দ্রীয় বলেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য নিয়ে প্রচুর লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ের অর্জনগুলোকে চিহ্নিত করে অনেকের আগেই; সেই সত্তরের দশক থেকে বলে এসেছেন–আমাদের মুক্তিযুদ্ধ অসমাপ্ত। এ কারণে ১৯৯৩ সালে জাহানারা ইমাম এক কথোপকথনে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন– সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাজ আমাদের দিকনির্দেশনা দেয় এবং আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে।

আমরা জানি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের তিনটি ঘোষিত নীতি ছিল– সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সেই প্রথম দিককার বই নিরাশ্রয় গৃহী (১৯৭৪) থেকে শুরু করে তাঁর স্বাধীনতা স্পৃহা ও সাম্যের ভয় (১৯৮৮)-এর ভেতর দিয়ে বিচ্ছিন্নতায় অসম্মতি (২০১৪) পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে মুক্তিযুদ্ধের ওই তিনটি ঘোষিত নীতি কখনও হয়ে উঠেছে সরাসরি বিষয়বস্তু এবং প্রায়ই থেকেছে বিচার-বিবেচনার লিপ্ত নিরিখ। এদিক থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে একজন নিরন্তর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও গণ্য করা চলে।  

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রথমত ও প্রধানত বাংলাদেশের লড়াকু বুদ্ধিজীবী বলেই বাংলাদেশের মেহনতি মানুষের সমস্যা ও সংগ্রাম তাঁর অসংখ্য রচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও পিতৃতন্ত্র ছাড়াও তাঁর প্রিয় বিষয় হচ্ছে জাতীয়তাবাদ। তিনি আমাদের সময়ে জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক। তিনি যেমন ঐতিহাসিক কারণে জাতীয়তাবাদের ভেতরে ক্ষেত্রবিশেষ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও উপনিবেশবাদবিরোধী উপাদান শনাক্ত করেছেন, তেমনি উগ্র জাতীয়তাবাদের সমালোচনাও করেছেন এটা বুঝিয়ে যে, সব জাতীয়তাবাদ এক ধরনের নয়। 

কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আন্তর্জাতিকতাবাদীও। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, চীনা বিপ্লব, কিউবার বিপ্লব, ভিয়েতনামের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তির লড়াইসহ তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াই নিয়েও লিখেছেন তিনি। প্রমাণ করেছেন, বিপ্লব ও সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা ব্যতিরেকে বিপ্লবী রাজনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পথ শনাক্ত ও প্রশস্ত করা সম্ভব নয়। তবে শুধু এ ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদ স্পষ্ট হয়ে থাকে, যেমন তা থাকে ইংরেজি সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্য নিয়ে তাঁর বিস্তর আলোচনায়। এ ক্ষেত্রে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন বটে। শুধু রাজনীতি, ইতিহাস বা জাতীয়তাবাদ নয়; অসংখ্য বিষয় নিয়ে লিখেছেন তিনি। এখানে তাঁর কিছু প্রিয় বিষয়বস্তুর একটা সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া যেতে পারে এভাবে– বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি, সাম্য ও স্বাধীনতা, বামপন্থি রাজনীতি, বিপ্লবী রাজনীতি, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, পিতৃতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন, সমাজ ও সংস্কৃতি, শ্রেণি ও সাহিত্য ইত্যাদি। 

যদিও বর্তমান রচনার প্রধান বিষয়বস্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাহিত্য সমালোচনা ও সংস্কৃতি সমালোচনা নয়; তবু এ বিষয় নিয়ে দু-একটা কথা না বললেই নয়। তিনি সমান দক্ষতায় বিচরণ করেছেন বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের সমালোচনার এলাকায়। প্রশ্ন তোলার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি বিশিষ্ট। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি প্রধান সাহিত্যিককে নিয়ে তিনি লিখেছেন প্রচুর। লিখেছেন তিনি বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, জসীম উদ্‌দীন, জীবনানন্দসহ অনেক লেখককে নিয়ে। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রায় সমান্তরালবিহীন। কিন্তু তিনি আরও বিশিষ্ট এই কারণে, সাহিত্যিক মহারথীদের বন্দনা করা বা আনুগত্যের সংস্কৃতির মধ্যে থেকেই তিনি সাহিত্যিক এস্টাবলিশমেন্টকে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন করেছেন সাহস নিয়ে। তিনি প্রশ্ন করার জন্যই শুধু প্রশ্ন করেননি। প্রশ্ন করেছেন বঙ্কিমকে, শরৎচন্দ্রকে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ রবীন্দ্রনাথকেও; জনগণের সমষ্টিগত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের পরিপ্রেক্ষিতেই। ইংরেজি সাহিত্যের সমালোচনার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। যখন ইংরেজির ডাকসাইটে অধ্যাপকরা আইরিশ-ইঙ্গ-মার্কিন আধুনিকতাবাদীদের, অর্থাৎ ইয়েটস, পাউন্ড, এলিয়ট, লরেন্স, জয়েস প্রমুখকে বন্দনা করতে ব্যস্ত, ঠিক তখন বিস্ফোরণের আকারে প্রকাশিত হয় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বই প্রতিক্রিয়াশীলতা আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যে; যেখানে তিনি অসাধারণ দক্ষতা সহকারে ওইসব সাহিত্যিক মহারথীর ফাঁক ও ফাঁকি চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক অবস্থানের সমস্যাগুলো চিনিয়ে দেন। হ্যাঁ, তিনি ‘ক্রিটিক’-এর পর ‘ক্রিটিক’ হাজির করেছেন। সেগুলো বাংলাদেশে সাহিত্য সমালোচনার শুধু নতুন দিগন্তই উন্মোচন করেনি; জনগণের মুক্তির সংগ্রামে হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। 

জনগণের মুক্তির সংগ্রামের স্বার্থেই আমাদের সময়ের অন্যতম প্রধান লড়াকু বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আরও দীর্ঘ সক্রিয় জীবন কামনা করি। তাঁকে জানাই লড়াকু অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা। ২৩ জুন তাঁর ৯১তম জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজফার হোসেন: কবি, লেখক-গবেষক, ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক

আরও পড়ুন

×