বাণিজ্য থেকে ইরান যুদ্ধ, ট্রাম্প-শির বৈঠকে চাপের কৌশল কী
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: সংগৃহীত
এএফপি
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ২০:৩১ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ২০:৫২
বাণিজ্য যুদ্ধের পর চীনের মিত্র ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত বাঁধিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিই ঝাঁকুনি খাচ্ছে। এ অবস্থায় ট্রাম্পের আলোচিত বেইজিং সফরে কী নিয়ে দর-কষাকষি হতে যাচ্ছে?
বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, সফরটি হবে ১৩ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত। এ সময় শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বেইজিং; ছোট কিন্তু সুনির্দিষ্ট কিছু অর্জন করতে চাইবে। তবে ট্রাম্পের খামখেয়ালি স্বভাবের কথাও তারা মাথায় রাখবে।
সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বেঞ্জামিন হো বলছেন, চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন চায়, তবে তারা জানে এর সম্ভাবনা খুবই কম।
গত বছর ওয়াশিংটন ও বেইজিং এক ভয়াবহ বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়েছিল। সে সময় অনেক চীনা পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ওঠে। গত অক্টোবরে দুই দেশ এক বছরের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসন্ন বৈঠকে বেইজিংয়ের প্রাথমিক লক্ষ্য হবে সেই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ইউ সু বলছেন, বেইজিং সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য অর্জনে সন্তুষ্ট থাকবে। যেমন- শুল্কের হার সীমিত পর্যায়ে কমিয়ে আনা। এতে চীনও তাদের নিজস্ব শুল্ক বা রপ্তানি বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করার যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পাবে।
ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প-শি বৈঠকে ইরান ইস্যু এড়ানো বেশ কঠিন। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের লিজি লি বলছেন, তেহরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের আগে থেকেই চীনের ওপর চাপ বাড়াতে শুরু করেছে।
গত মাসে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, চীন যদি ইরানকে কোনো ধরনের সামরিক সহায়তা দেয়, তবে তিনি দেশটির পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন।
বেইজিং তেহরানের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য অংশীদার এবং তারা ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে অবৈধ বলে অভিহিত করেছে। তবে একইসঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার সমালোচনাও করেছে। খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে হরমুজ প্রণালি।
ইআইইউ-এর বিশেষজ্ঞ ইউ সু’র মতে, ইরান বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চাপ চীন মেনে নেবে না। কারণ এই দেশগুলোর ওপর চীনের কিছুটা প্রভাব থাকলেও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নেই।
লিজি লি’র মতে, ইরান যুদ্ধ দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক চাপের আরেকটি স্তর তৈরি করবে। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ।
দর-কষাকষির হাতিয়ার কী
চীনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো তাদের ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ। যা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে অপরিহার্য।
প্রাকৃতিক মজুত, খনন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উদ্ভাবন- বিরল খনিজের প্রতিটি স্তরে চীন কয়েক দশক ধরে আধিপত্য বজায় রেখেছে। ইআইইউ-এর বিশেষজ্ঞ ইউ সু মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থেকে বড় ধরনের কোনো ছাড় আদায়ের প্রয়োজন হলে এটিই হবে চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ট্রিভিয়াম চায়না’র ভূরাজনীতি বিশ্লেষক জো মাজুর বলছেন, ট্রাম্প বিরল খনিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ‘খুবই চিন্তিত’। এটি এমন একটি বিষয় যেটির সমাধানে ট্রাম্পের হাতে সহজ কোনো উপায় নেই।
একটি ‘লং গেম’
লিজি লি’র মতে, বেইজিং সতর্কতার সঙ্গে এই আলোচনায় বসবে। চীন বিশ্বাস করে, তারা এখন আগের চেয়ে ভালোভাবে চাপ সামলাতে সক্ষম। এছাড়া, ট্রাম্পের তুলনায় তারা ‘লং গেম’ বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের খেলাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে চাপের মুখে আছেন। চীন এটিকে কাজে লাগাতে চাইবে। এ ছাড়া, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিং সফরের বিষয়টিও আলোচনায়।
জো মাজুর বলছেন, ট্রাম্পের সফরের পরপরই পুতিনের সফর একটি বার্তা দেয়। সেটি হলো- ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার পরও মস্কোর সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্কে ভাটা পড়বে না। চীন-রাশিয়ার এই সম্পর্ক পাথরের মতো কঠিন।
