ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি
হামলার হুমকি চুক্তির চাপ
হরমুজ ব্যবস্থাপনায় নতুন সংস্থা ঘোষণা ইরানের
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১০:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা অব্যাহত আছে। এ অবস্থায় দ্রুতই একটি চুক্তিতে পৌঁছতে চায় ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আবারও হুমকি দিয়ে বলেছেন, তেহরানের হাতে সময় ফুরিয়ে আসছে। অপরদিকে তেহরান বলেছে, তারা যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো প্রস্তাবের জবাব পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে পাঠিয়েছে।
এমন এক সময় ট্রাম্প চুক্তির জন্য এ চাপ দিচ্ছেন, যখন নিজ দেশেই তিনি বড় চাপের মুখে আছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকছে। অধিকাংশ মার্কিনি মনে করেন– ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোটা ছিল ট্রাম্পের ভুল। পাশাপাশি বেইজিং সফর থেকে প্রায় শূন্য হাতে ফেরার পর তার অনুমোদনের হার আরও কমেছে।
গতকাল সোমবার দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তিতে সম্মত হতে বলেছেন। অন্যথায় ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হবে বলেও বর্ণনা করেন তিনি। স্থানীয় সময় রোববার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি বলেন, ‘ইরানের সময় ফুরিয়ে আসছে। তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, নইলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ!’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করতে ট্রাম্প আজ মঙ্গলবার শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। খবরটি এমন সময় এলো যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন হামলায় একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন লেগে যায়। আমিরাত এটিকে অত্যন্ত ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে বর্ণনা করেছে। তারা এ জন্য ইরান বা তার সমর্থক শক্তিকে দায়ী করেছে। সৌদি আরব তিনটি ড্রোন প্রতিহত করার খবর দিয়েছে।
একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য বেশ কয়েকটি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে একমত হতে হবে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যে কোনো বৃহত্তর শান্তি চুক্তির আগে লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। লেবাননের কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, যুদ্ধবিরতির মধ্যে গত রোববার ইসরায়েলের বিমান হামলায় লেবাননে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন।
এ অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কূটনীতিও চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। আলজাজিরা জানায়, গতকাল সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। পরে আরাঘচি টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, তারা আঞ্চলিক বিষয় ও তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে চলা কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে কথা বলেন।
যুদ্ধ শেষ করার প্রস্তাবের জবাব পাঠিয়েছে ইরান
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার সর্বশেষ মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে ইরান একটি প্রতিক্রিয়া জমা দিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন– সর্বশেষ মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে তেহরানের প্রতিক্রিয়া ‘মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে মার্কিন পক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।’
ছয় সপ্তাহের লড়াই মূলত থামিয়ে দেওয়া একটি যুদ্ধবিরতির আওতায় সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরান বেশ কয়েকটি প্রস্তাব বিনিময় করেছে। তবে সম্প্রতি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনা থমকে গেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটাকে যুদ্ধবিরতি ‘লাইফ সাপোর্টে’ আছে বলে বর্ণনা করেন।
ইরানের নতুন প্রস্তাব যথেষ্ট নয়, যুদ্ধ শুরু হতে পারে: মার্কিন কর্মকর্তা
হোয়াইট হাউস মনে করে, ইরানের পাঠানো সর্বশেষ প্রস্তাবে তেমন কোনো বড় উন্নতি হয়নি। একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য এটি একেবারেই অপর্যাপ্ত। এ কারণে নতুন প্রস্তাবও যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করেনি। এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ তথ্য জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে ইচ্ছুক। কিন্তু ট্রাম্পের একাধিক দাবি ইরান প্রত্যাখ্যান করায় এবং নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো অর্থবহ ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
গত রোববার রাতে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের পাল্টা প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এসে পৌঁছায়। তবে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার মতে, এ প্রস্তাবে আগেরটির তুলনায় নামমাত্র পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে ইরান তাদের পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতির কথা কিছুটা বিস্তারিতভাবে জানিয়েছে। তবে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত করার বিষয়ে বা ইতোমধ্যে মজুত করা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
হরমুজ ব্যবস্থাপনায় নতুন সংস্থা ঘোষণা করল ইরান
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নতুন সংস্থা গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার শিকার হলে তেহরান এ প্রণালিটি নিজেদের শত্রুভাবাপন্ন মনে করা দেশগুলোর জন্য কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয়; তারা প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য অর্থ আদায় করতে চায়।
সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ তাদের আনুষ্ঠানিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের (পিজিএসএ) একটি পোস্ট শেয়ার করেছে, যেখানে বলা হয়– সংস্থাটি ‘হরমুজ প্রণালির কার্যক্রম ও সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে রিয়েল-টাইম আপডেট’ দেবে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোকে ভুল মনে করেন মার্কিনিরা
নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন ভোটার মনে করেন– ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য ভুল ছিল। তাঁর জনপ্রিয়তার হার কমতে থাকায় এবং অর্থনৈতিক উদ্বেগ বাড়তে থাকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টি এক নড়বড়ে রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। অধিকাংশ ভোটার বলেছেন, এ যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করাটা যুক্তিযুক্ত ছিল না এবং অর্থনীতি সম্পর্কে তারা গভীরভাবে হতাশাবাদী মনোভাব পোষণ করেন।
গতকাল নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এ যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত অজনপ্রিয় বলে বর্ণনা করা হয়। দেড় হাজারের বেশি ভোটারের ওপর চালানো জরিপের ভিত্তিতে বলা হয়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার বলেছেন, যুদ্ধে যাওয়াটা একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এর মধ্যে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ স্বতন্ত্র ভোটারও রয়েছেন। ভোটারের এক-চতুর্থাংশের কম মনে করেছেন– এ সংঘাতের ব্যয়ভার বহন করাটা যুক্তিযুক্ত ছিল।
রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের কাজ ও যুদ্ধকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ভোটার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়সহ অন্যান্য প্রধান বিষয়গুলোতে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে গুরুতর সংশয় প্রকাশ করেছেন। সব ভোটারের চৌষট্টি শতাংশ তাঁর অর্থনীতি পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
সৌদিতে যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনা মোতায়েন পাকিস্তানের
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে আট হাজার সেনা, এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান ও একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রধান ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও রিয়াদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা জোরদার করল ইসলামাবাদ।
এ মোতায়েনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এবারই প্রথম সামনে এলো। তিনজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দুটি সরকারি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা সবাই এটিকে একটি বড় ও যুদ্ধ-প্রস্তুত বাহিনী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার উদ্দেশ্য সৌদি আরব আবার কোনো হামলার শিকার হলে দেশটির সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করা। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবের সরকারি গণমাধ্যম শাখা– কোনো পক্ষই এ মোতায়েনের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
গত বছর স্বাক্ষরিত এ প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণ শর্তাবলি গোপন রাখা হয়েছে। তবে উভয়পক্ষই জানিয়েছে, কোনো এক পক্ষ আক্রান্ত হলে পাকিস্তান ও সৌদি আরব একে অপরের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসতে বাধ্য থাকবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এর আগে আভাস দিয়েছিলেন– এ চুক্তির ফলে সৌদি আরব পাকিস্তানের পারমাণবিক সুরক্ষার (নিউক্লিয়ার আমব্রেলা) আওতায় এসেছে।
সূত্রগুলো জানায়, পাকিস্তান প্রায় ১৬টি যুদ্ধবিমানের একটি পূর্ণ স্কোয়াড্রন পাঠিয়েছে, যার বেশির ভাগই চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ ফাইটার। গত এপ্রিলের শুরুতে এগুলো সৌদি আরবে পাঠানো হয়। দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, পাকিস্তান দুই স্কোয়াড্রন ড্রোনও পাঠিয়েছে। পাঁচটি সূত্রই জানিয়েছে, এ মোতায়েনের মধ্যে প্রায় আট হাজার সেনা রয়েছেন; প্রয়োজন হলে আরও সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি একটি চীনা এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও পাঠানো হয়েছে।
- বিষয় :
- যুদ্ধবিরতি
- ইরান যুদ্ধ
- যুক্তরাষ্ট্র
