ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিজেদের প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক স্বার্থের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র

নিজেদের প্রতিষ্ঠানে  শ্রমিক স্বার্থের  বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র
×

 কূটনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৩ সাল। তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন ও রানা প্লাজা ধসের পর কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক অধিকারের ঘাটতি দেখিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা জিএসপি স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৩ সাল। বিশ্বজুড়ে শ্রম অধিকার রক্ষায় নতুন নীতি ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের। শ্রমিকের অধিকার রক্ষা না করলে জবাবদিহির আওতায় আনার ঘোষণা। এর মধ্যে আছে নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, ভিসা নিষেধাজ্ঞাসহ দেশটির আইনে থাকা এ-সংক্রান্ত সব ব্যবস্থা। 

সর্বশেষ বিশ্বজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের দরকষাকষিতে অন্যতম হাতিয়ারও ছিল এই শ্রম অধিকার। বাংলাদেশের সঙ্গে করা যুক্তরাষ্ট্রের বহুল সমালোচিত বাণিজ্য চুক্তি বা অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেডেও (আর্ট) শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষায় মালিকপক্ষের জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর শর্ত দেয় দেশটি। 

কিন্তু বাংলাদেশে ব্যবসায় যুক্ত মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরতদের অধিকারের বিষয়ে তাদের অবস্থান অনেকটা বিপরীতমুখী। 

বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, বিদেশি এই প্রতিষ্ঠানগুলো যে মুনাফা করবে তার ৫ শতাংশ শ্রমিকরা পাবে। কিন্তু তেল-গ্যাস খাতে শতভাগ বৈদেশিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে দেশটি। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে করা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ লভ্যাংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দেড় শতাংশ করা হয়েছে। এতে শ্রমিকরা আর্থিকভাবে বঞ্চিত হবে এবং তাদের আইন প্রদত্ত অধিকার ক্ষুণ্ন হবে।  

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সমকাল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

তবে সাখাওয়াত হোসেন চ্যানেল ওয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমার সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে। বিনিয়োগ বন্ধ, শুল্ক না কমানোর মতো চাপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। তবে এটা অধ্যাদেশ, আইন হয়নি। সরকার যদি চায় যে কোনো সময় বাতিল করতে পারে।’

শ্রমিকের লভ্যাংশ কমানো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সমকালকে বলেন, ‘সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সেখানে দরপত্র কিনেছে, কিন্তু জমা দেয়নি এমন চারটি প্রতিষ্ঠান ছিল। আমরা তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করেছি।’

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে। আর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছাড়ার এক দিন আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি একটি এসআরও জারি করে। তাতে বলা হয়, তেল এবং গ্যাস মিশ্রণ, পরিশোধন বা শোধনসহ খনি, তেলকূপ অথবা খনিজ মজুতের অন্যান্য উৎসে শিল্প-সম্পর্কিত কাজকর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভের ৫ শতাংশ শ্রমিকে দেওয়ার বিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ৫ শতাংশের জায়গায় দেড় শতাংশ লভ্যাংশ দেবে। 
যদিও বাণিজ্য চুক্তির ২-এর ৯ ধারায় বলা রয়েছে, বাংলাদেশ তার শ্রম আইনে প্রদত্ত সুরক্ষাসমূহকে দুর্বল বা হ্রাস করবে না। আর বাণিজ্য বা বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে এ পর্যন্ত করা যে কোনো আইন দুর্বল হলে, তার সমাধান করবে।

এমন শর্তের বিপরীতে শ্রমিকের স্বার্থবিরোধী এসআরওর কার্যকারিতা কী হবে– জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘বিষয়টি উচ্চ আদালতে রয়েছে। আদালতের রায়ের অপেক্ষা করছি আমরা। আমি ব্যক্তিগতভাবে আশাবাদী, রায় শ্রমিকের পক্ষে যাবে।’
বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাস উত্তোলনের প্রায় ৫৬ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের শেভরনের নিয়ন্ত্রণে। আর যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান তাল্লো উত্তোলন করে প্রায় ২ শতাংশ। বাকি ৪২ শতাংশ উত্তোলন করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, মূলত শেভরন তাদের লাভের অঙ্ক জানাতে চায় না। শ্রমিকের লভ্যাংশ কম দিতে তারা বহুদিন ধরেই চেষ্টা করছে। 

শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার সমকালকে বলেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শ্রমিকের সুবিধা কমানো যায় না, বরং বাড়ানো যায়। ড. ইউনূস সরকারের সর্বশেষ কার্যদিবসে এই এসআরওটি করা হয়েছে, বিষয়টি কলঙ্কজনক। তিনি বলেন, এটি শেভরনসহ তেল-গ্যাসের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে করা হয়েছে। এটি নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতে গিয়েছি এবং তিন মাসের স্থগিতাদেশ পেয়েছি। নির্বাচিত সরকারের কাছে দাবি থাকবে, যাতে এটি বাতিল করা হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে ইমেইল করা হয়েছে। তবে তাদের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

 

আরও পড়ুন

×