লেবাননে যুদ্ধ থামছে না কেন
ছবি: বিবিসি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ১২:০২
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে পৌঁছানো একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি এখন চরম ঝুঁকির মুখে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে ক্রমাগত চলতে থাকা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষই এর মূল কারণ। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকে লেবাননে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছিল। মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই অব্যাহত লড়াইয়ের কারণে তেহরানের পরমাণু কার্যক্রম ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো দীর্ঘমেয়াদি জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা স্থগিত করতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র। এ পরিস্থিতিতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করলেও আলোচনার জন্য গতকাল রোববার সুইজারল্যান্ডে জড়ো হয়েছেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
সংঘাতের নেপথ্যে
১৯৮০-এর দশকে লেবাননে প্রতিষ্ঠিত ইরান-সমর্থিত শিয়া ইসলামপন্থি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী আধা সামরিক বাহিনী। কয়েক দশক ধরেই ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের শত্রুতা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা শুরু করলে হিজবুল্লাহ দখলদার দেশটিতে রকেট ছুড়তে থাকে। দীর্ঘ এক বছরের লড়াইয়ে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর দীর্ঘকালীন প্রধান হাসান নাসারুল্লাহকে হত্যা করে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইসরায়েলি বাহিনী লেবানন থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করেনি। বরং চুক্তি লঙ্ঘন করে প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে যেতে থাকে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলে সংঘাতের ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হয়। এর জবাবে মার্চ থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে পাল্টা হামলা শুরু করে। এর পর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে তীব্র বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করে একটি বাফার জোন তৈরির চেষ্টা চালায়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই নতুন দফার ইসরায়েলের হামলায় চার হাজার ৫৭ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এতে দক্ষিণ লেবানন কার্যত জনশূন্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ইরান চুক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের প্রথম দফাতেই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন, এই চুক্তির আওতায় তিনি ইসরায়েল, হিজবুল্লাহ, লেবাননসহ সব পক্ষে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি আশা করেন। ইরানের জন্য তাদের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক মিত্র হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করা ছিল আলোচনার মূল শর্ত। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তি মানতে নারাজ। উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরও মার্কিন চাপকে উপেক্ষা করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। হিজবুল্লাহ ও ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। এদিকে, ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও সুর বদলাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স লেবাননে ইসরায়েলের লাগাতার হামলা এবং ইরান চুক্তির বিরোধিতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সরকারের অসহায়ত্ব
এই বহুপক্ষীয় ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় বলির পাঁঠা হয়েছে লেবানন সরকার। সুইজারল্যান্ডে চলমান শান্তি আলোচনায় লেবানন সরকার সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। আবার তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে ইসরায়েলকে থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৯ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধস এবং ২০২৪ সালের যুদ্ধের ক্ষত দগদগে থাকতেই নতুন এই যুদ্ধ লেবাননকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, চলমান সংঘাতের কারণে লেবাননের অর্থনীতি আরও ১০ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে এবং যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তিন দিনে ৬ ইসরায়েলি সেনা নিহত
লেবাননের যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীও তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। দেশটির আর্মি রেডিওর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিনে হিজবুল্লাহর হামলায় একজন সিনিয়র অফিসারসহ ছয় ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং ২০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই নতুন দফার লড়াইয়ে দক্ষিণ লেবাননে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৬ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- ইরান
- লেবানন
