'ধ্বংসস্তূপের নিচে আমার ছেলের কান্না শুনতে পাচ্ছি'
ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবনসঙ্গী ও শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের সঙ্গে আটকে থাকা ছেলেকে নিয়ে শঙ্কায় আন্দ্রেইনা ভ্যালেরিও। ছবি: বিবিসি
বিবিসি
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ১১:০০
ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ দুটি ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে এখনও চলছে জীবিতদের উদ্ধারে মরিয়া অভিযান। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের জীবিত উদ্ধারের আশায় দিন-রাত অপেক্ষা করছেন হাজারো মানুষ। তাদেরই একজন আন্দ্রেইনা ভ্যালেরিও। প্রায় দুই বছর বয়সী ছেলে সান্তিয়াগোকে উদ্ধারের আশায় এখনও ধ্বংসস্তূপ ছেড়ে যাননি তিনি।
ভূমিকম্পের দিন কর্মস্থল থেকে দ্রুত শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে ছুটে যান আন্দ্রেইনা। সেখানে ছিলেন তার ছেলে সান্তিয়াগো এবং জীবনসঙ্গী রামসেস মেনদোজা। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি দেখেন, বহুতল ভবনটি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ধ্বংসস্তূপের পাশে তখন স্বজনদের খুঁজছিলেন তার দেবর স্যামুয়েল মেনদোজা।
শনিবার বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আন্দ্রেইনা জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও আটকে রয়েছেন তার ছেলে, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, দাদা-দাদি শ্বশুর এবং ননদ। তবুও তিনি আশা হারাননি। তিনি বলেন, 'আমি এখনও বিশ্বাস করি আমার ছেলে বেঁচে আছে। আমি একটি শিশুর কান্নার শব্দ শুনেছি। আমি বিশ্বাস করি সেটি আমার ছেলেরই কান্না। আমি জানি, আমার ছেলে এবং তার পরিবারের সবাই এই বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসবে।'
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ভবনের নিচে আরও অন্তত দুটি শিশু আটকা পড়ে আছে। তাদের একজন নয় বছর বয়সী লুকাস এবং অন্যজন তিন বছরের আরাঞ্জা।
আন্দ্রেইনা ও স্যামুয়েলের মতো অসংখ্য মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া স্বজনদের উদ্ধারে খালি হাতেই ইট-পাথর সরিয়ে যাচ্ছেন। লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে এমন দৃশ্য এখন সর্বত্র। বিবিসির প্রতিবেদক জানিয়েছেন, যাদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন, তাদের অধিকাংশই কয়েক রাত ধরে ঘুমাননি। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের ডাকতে ডাকতে অনেকের কণ্ঠ ভেঙে গেছে।
শুক্রবার দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশীরা উদ্ধারকাজে যোগ দেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও মানুষ ছুটে আসেন সহযোগিতা করতে। যদিও উদ্ধারকারী দল সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবুও বহু মানুষের অভিযোগ, এত বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলার প্রস্তুতি ছিল না।
লা গুয়াইরার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫০টির বেশি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখা গেছে। সরকারি হিসাবে, শুধু এই অঙ্গরাজ্যেই ১ হাজার ৪০০টির বেশি ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ এই ভূমিকম্পকে গত ১২৩ বছরের মধ্যে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ বলে উল্লেখ করেছেন।
সরকারি হিসাবে, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২৩৮ জন। তবে এখনও ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লা গুয়াইরার বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, নিরাপত্তা ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় অঙ্গরাজ্যটিতে ১৪ হাজার নিরাপত্তা সদস্য পাঠানো হয়েছে। প্রথম দিকে উদ্ধারকাজে ভারী যন্ত্রপাতির অভাব ছিল। পরে ভাঙা ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পেরিয়ে ধীরে ধীরে ভারী যন্ত্রপাতি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে শুরু করে। উদ্ধারকাজ চলার সময় স্বজনদের কান্না ও চিৎকার থামানোর চেষ্টা করা হলেও নিখোঁজদের খোঁজে মরিয়া মানুষের আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে।
ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, শনিবারের মধ্যে ১০টি দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল লা গুয়াইরায় পৌঁছানোর কথা। তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে সাধারণ মানুষকে লা গুয়াইরায় না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ বলেছেন, অঙ্গরাজ্যটি 'ভয়াবহভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।'
এরই মধ্যে ধ্বংসস্তূপের পাশে দিন-রাত অপেক্ষা করছেন হাজারো স্বজন। তাদের অনেকের বিশ্বাস, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনও জীবনের ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে। আর সেই আশাতেই তারা অপেক্ষা করছেন-হয়তো পরবর্তী মুহূর্তেই জীবিত ফিরে আসবে প্রিয়জন।
- বিষয় :
- ভেনেজুয়েলা
- ভূমিকম্প
