নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে গণতান্ত্রিক সংস্কারের তাগিদ
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ১২:১১
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশে নারী উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে বলে মত দিয়েছেন বক্তারা। এ লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার-সংবেদনশীল সংস্কার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ওয়েভ ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব বিকাশ’ শীর্ষক জাতীয় সিম্পোজিয়ামে এসব কথা বলেন বক্তারা। একশনএইড বাংলাদেশের সহযোগিতায় আয়োজিত দিনব্যাপী এ সিম্পোজিয়ামে রাজনীতিবিদ, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলীর সভাপতিত্বে সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বিকাশে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সিম্পোজিয়ামের উদ্বোধনী অধিবেশনে ‘জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর আরপিও-সংক্রান্ত অবস্থান’ শীর্ষক একটি সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করেন গবেষক ও পরামর্শক সানাইয়া ফাহীম আনসারী। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব এবং নারীর প্রতি রাজনৈতিক সহিংসতা বিষয়ে দুটি পৃথক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা, নুসরাত তাবাসসুম ও সানজিদা ইসলাম তুলি, নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ, ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলী সিং, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (পলিটিক্যাল) হ্যারি থমসন, কানাডিয়ান হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড জেন্ডার ইকুয়ালিটি) স্টেফানি সেন্ট লরেন্ট ব্রাজার্ড, একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
বক্তারা বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে নারীদের শুধু ভোটার হিসেবে নয়, প্রার্থী, নেতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীর অংশগ্রহণকে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্বাগত বক্তব্যে ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী বলেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব বিকাশে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। এই সচেতনতা বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে নারী রাজনীতিকদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উদ্বোধনী আলোচনায় সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা বলেন, নারী-পুরুষ উভয়েই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারাটাই গণতান্ত্রিক সংস্কার। ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলী সিং বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র শুধু নারীর ইস্যু নয়, এটি গণতন্ত্রের জন্যও অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক সুশাসন শক্তিশালী করতে নারীদের শুধু ভোটার নয়, নির্বাচনে প্রার্থী, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (পলিটিক্যাল) হ্যারি থমসন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীর অন্তর্ভুক্তিকে কেবল সুযোগ হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখতে হবে। কানাডিয়ান হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড জেন্ডার ইকুয়ালিটি) স্টেফানি সেন্ট লরেন্ট ব্রাজার্ড বলেন, জেন্ডার সমতা শুধু গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নও জড়িত।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, রাজনীতিতে গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্বের বিকাশ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আরপিও বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন কমিশনের নয়; এতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীরও ভূমিকা রয়েছে। নারীর প্রতি সব ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সিম্পোজিয়ামে আলোচনা ও বিভাগীয় সংলাপের সুপারিশের ভিত্তিতে ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দাবিনামা’-এর একটি খসড়া উপস্থাপন করা হয়। এতে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্দিষ্টসংখ্যক নারী প্রার্থীর বাধ্যতামূলক মনোনয়ন, দীর্ঘমেয়াদে নারী-পুরুষের ৫০-৫০ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক দলগুলোর জেন্ডার নিরীক্ষা, নারীর প্রতি রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধে অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকারে সাধারণ আসনের এক-তৃতীয়াংশে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের বিধান রাখার সুপারিশ করা হয়।
ওয়েভ ফাউন্ডেশন জানায়, একশনএইড বাংলাদেশের অংশীদারিত্বে ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্তগ্রহণ কাঠামো শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় এ জাতীয় সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতায় ইউএন ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট (ব্যালট ও ডিআরআইপি)-এর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নরওয়ে, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড সরকারের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
