মেসিদের সামনে দুরন্ত কেপ ভার্দে
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ১৩:৪৪
ডাউন টাউনের নিভু আলোর পাব থেকে শুরু করে আর্লিংটনের মেক্সিকান রেস্টুরেন্ট, বাসের ভিড়ে কিংবা ওয়ালমার্টের গ্রোসারি লনে– চারপাশে কেবলই আকাশি-সাদা জার্সির মেলা। ‘মেসি– নাম্বার টেন’ লেখা জার্সির হাজার হাজার ‘মেসি’ এই মুহূর্তে দখল নিয়েছে ডালাসের। সেখানে আসল মেসি এলেন ম্যাচের চব্বিশ ঘণ্টা আগে কানসাস থেকে। তাঁকে বরণ করে নিতে এদিন কয়েকশ ভক্তের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা টিম হোটেলের সামনে শুধু এক লহমার আশায়, যদি বাসের কাচ পেরিয়ে একটু দেখা যায় প্রিয়কে। দেখেওছিলেন অনেকে। তবে দি অ্যাডালফস-এর হোটেলরুমে মেসিরা বোধ হয় ছিলেন লটারির ভাগ্য জানতে। কে হবেন তাদের রাউন্ড অব থার্টিটু-এর প্রতিপক্ষ? সন্ধ্যার পর যে নামটি সামনে এলো, তাকে রসাত্মকই বলা যায়।
কয়েক মাস ধরে উরুগুয়েকে নিয়ে পড়ালেখার পর পরীক্ষায় কিনা এলো আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ভেসে থাকা এক ফোঁটা দ্বীপ কেপ ভার্দে! দাবার বোড়ে সাজানোর আগেই যেন ম্যাচের স্কোরলাইন ফিসফিস করে কানে এসে বলছে, মেসিদের জন্য এটা নকআউট নয়, স্রেফ বিকেলবেলার একটি আরামদায়ক প্রীতি ম্যাচ! লটারির এই জ্যাকপট দেখে ডালাসের কফিশপগুলোতে যখন হাসির রোল, তখন ফুটবল রোমান্টিকরা ভাবছেন, আর্জেন্টিনার এই চিলড্রেনস পার্কের রাইডে চড়ার ম্যাচে আর যা-ই হোক, কোনো স্নায়ুর চাপ নেই। আফ্রিকার এই ‘ব্লু শার্কস’ বা নীল হাঙরদের নীল-সাদা সুনামি দিয়ে ডাঙার মাছ বানিয়ে ছাড়তে আর্জেন্টিনার কত মিনিট সময় লাগবে, দোহাই– এ নিয়ে কোনো বাজির দর অন্তত খোলার ভুল করবেন না!
এদিন যে ছয়টি ম্যাচ আমেরিকা, মেক্সিকো ও কানাডার ছয় প্রান্তে ছিল, তার দুটির দিকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিলেন মেসি অ্যান্ড কোং। ফ্রান্স-নরওয়ে ম্যাচে কি আর গোল করতে পারবেন এমবাপ্পে? স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচ কি হবে ড্র? ড্র হলে উরুগুয়ের আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসার স্ট্র্যাটেজির সামনে পড়তে হতো মেসিদের।
দুটির একটিও হলো না। মেসিদের অনেকটাই স্বস্তি। তাদের সামনে নকআউটে নবীনতম কেপ ভার্দে; প্রবীণ ভোজিনহার কেপ ভার্দে। গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ না হেরে এবং কোনোটিতে না জিতে শুধু তিন ম্যাচ ড্র করেই প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে নকআউটে কেপ ভার্দে। স্পেনের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে গোলরক্ষক ভোজিনহার বীরত্বগাথায় গোলশূন্য ড্র। পরের ম্যাচে উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে সমতা এবং শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গেও ০-০। ব্যস, নকআউটের গর্বের মঞ্চে এখন তারা।
আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে আন্ডারডগ তকমা উড়িয়ে দিয়ে তাদের কোচ বুবিস্তা সটান বলেছেন, ‘আমাদের কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। গ্রুপ পর্বে আমরা অপরাজেয় থেকেছি এবং প্রমাণ করেছি যে বড় কোনো বাধা বা কঠিন পরিস্থিতিতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’ তবে মেসির সামনে খেলতে নামার একটা রোমাঞ্চ তাদের মধ্যেও দোলা দিয়েছে। ‘আর্জেন্টিনার মতো দলের বিরুদ্ধে খেলতে পারাটা আমাদের জন্য পরম গর্বের বিষয়। মাঠে মেসি তো আছেনই, যাঁকে অনেকে সর্বকালের সেরা মনে করেন, প্লাস বিশ্বসেরা কিছু প্রতিভাও তাদের দলে আছে। তাদের বিরুদ্ধে নকআউটের মতো মঞ্চে খেলতে পারাটা আমাদের ছোট্ট দেশের জন্য একটা চমৎকার বিজ্ঞাপন।’
কেপ ভার্দের চমকের দিন সবচেয়ে হতাশ করেছে বোধ হয় উরুগুয়ে। সুয়ারেজকে নেননি বলে কোচ বিয়েলসাকে বিশ্বকাপের আগে একাধিকবার ধুইয়ে দিয়েছেন মেসির বন্ধু। এবার আরও ধোয়াধুয়ি হবে! এমনিতেই খবর ছিল, চার-পাঁচজন ফুটবলার তাঁর ট্রেনিং পদ্ধতি নিয়ে টুর্নামেন্টের মাঝেই ক্ষুব্ধ ছিলেন; এত বেশি প্র্যাকটিস কেন– প্রশ্ন তুলে স্পেন ম্যাচের আগে কার্যত বিদ্রোহ করেছিলেন।
বিয়েলসা ম্যাচের পর প্রেস মিটে যা বলে গেলেন, তা যেন এক ফুটবল দার্শনিকের মৃত্যুঘণ্টা, ‘আমি উরুগুয়ে ফুটবলকে কী দিতে পারলাম! কিছুই না। কেননা জাতীয় দলে কোনো কোচ তখনই কিছু দিতে পারেন, যদি কিছু ইতিবাচক ফল হয়। যদি আপনারা আমাকে প্রশ্ন করেন, উরুগুয়ে আমাকে কীভাবে মনে রাখবে, তাহলে একটা কথাই বলব– আমি এমন একজন কোচ, যে কিছুই দিতে পারিনি। তবে আজকের ম্যাচটা ড্র হওয়া উচিত ছিল।’
এই শেষ বত্রিশের ম্যাচটি দেখবেন বলে আগেই বলে রেখেছিলেন সুয়ারেজ। একে তো ম্যাচটি মায়ামিতে, তার ওপর তাঁর বন্ধু মেসি খেলবেন এবং সম্ভাব্য আরেকটি কারণ ছিল উরুগুয়ের খেলা। সেই আশায় এখন গুড়ে বালি। আপাতত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সামনে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। শেষ ষোলোয় তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হবে অস্ট্রেলিয়া আর মিসর ম্যাচের জয়ী দল। কোয়ার্টারে গিয়ে দেখা হতে পারে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। সেটি না হলে সুইজারল্যান্ড। সেটি জিতে গেলে সেমিতে দেখা হতে পারে চির প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল কিংবা ইংল্যান্ড।
এই সুযোগে ব্রাজিলের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষদের নামও বলে দেওয়া যাক। সব ম্যাচ জিততে থাকলে শেষ বত্রিশে জাপান, শেষ ষোলোয় আইভরি কোস্ট ও নরওয়ে ম্যাচের জয়ী দল। কোয়ার্টারে গিয়ে ইংল্যান্ড আর সেমিতে গিয়ে আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টাইন সমর্থক ও গোঁড়া মেসি ভক্তদের শেষ ষোলো পর্যন্ত আর চিন্তা নেই। আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হিসেবে কেপ ভার্দে ক্ষুদ্র একটি দ্বীপরাষ্ট্র হলেও তাদের স্প্যানিশ ও উরুগুয়ের মতো দলকে রুখে দেওয়ার স্পর্ধাই বিশ্বকাপের প্রকৃত সৌন্দর্য তুলে ধরে। তবে মেসিদের সামনে মাঠের নগ্ন বাস্তবতায়, এই পাঁচ লাখের রূপকথাকে আটলান্টিকের পানিতেই বিসর্জন দিয়ে আর্জেন্টিনা পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট নিশ্চিত করবে।
- বিষয় :
- আর্জেন্টিনা
- কেপ ভার্দে
- বিশ্বকাপ ফুটবল
