ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ‘তলানিতে’ অস্ত্রের মজুদ, ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত
ছবি: এআই দিয়ে বানানো
সিএনএন
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৫৮ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১৪:০৪
ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সব সমরাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা তীব্র করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান হারে হামলা অব্যাহত থাকলে অস্ত্রের ওপর চাপ আরও তীব্র হবে; ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে।
বিশেষজ্ঞরা সিএনএনকে বলছেন, অস্ত্রের এই ঘাটতি ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ঝুঁকিতে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেন, ‘গত পাঁচ দিন ধরে যুদ্ধ যেভাবে চলছে, সেটি অব্যাহত থাকলে অস্ত্রের মজুত এতটাই কমে যাবে যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রথম ধাপে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আওতায় মার্কিন সামরিক বাহিনী কয়েক হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
সিএসআইএসে’র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্তত অর্ধেক ‘থাড’ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, প্রায় অর্ধেক ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ৩০ শতাংশ ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক গবেষক মাইকেল ও’হ্যানলন বলেন, ‘অস্ত্রের মজুত আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কমে গেছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
অস্ত্রের এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করা বেশ সময়সাপেক্ষ। মার্ক কানসিয়ান আরও বলেন, ‘বর্তমানে পেন্টাগন প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ১৫টি টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাচ্ছে। ২০২৬ সালে নতুন কোনো থাড ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সিএসআইএসসের মতে, যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরতে অন্তত তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগবে।
সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা এলেন ম্যাককাসকার জানান, ‘সমরাস্ত্রের মজুত আগের মতো করতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুই থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।’
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় বিশেষজ্ঞ জন ফেরারি বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বদলানোর জন্যও কংগ্রেস থেকে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ সময়ের ধীরগতির উৎপাদন প্রক্রিয়াই এখন বহাল রয়েছে।’
সম্প্রতি হোয়াইট হাউস ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত তহবিলের জন্য কংগ্রেসের কাছে আবেদন করেছে। তবে এই প্রস্তাব পাস হওয়া বেশ কঠিন। অন্যদিকে পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা জানান, সমরাস্ত্র শিল্প সম্প্রসারণে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত জুনে ট্রাম্প ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ প্রস্তাব করেছেন যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা যায়।
পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমেরিকার উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভাগটি কাজ করে যাচ্ছে যাতে সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি আসে।’ তবে মার্ক কানসিয়ান মনে করেন, সরকারের এই পদক্ষেপ কার্যকর হলেও এর প্রভাব হবে খুবই সীমিত।
বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের চাহিদা বাড়ায় অন্যান্য দেশকে নিজস্বভাবে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ কমতে পারে। গত বৃহস্পতিবার তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ইউক্রেনকে লাইসেন্স দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। জাপানের একটি প্যাট্রিয়ট কারখানা তৈরি করতে তিন বছর সময় লেগেছে। অন্যদিকে, জার্মানি ২০২২ সালে কাজ শুরু করলেও এখনো কোনো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের এই সংকট বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করতে এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে বিপুল পরিমাণ মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হবে। তখন ঝুঁকিতে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। প্রেসিডেন্টের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো সময় এবং স্থানে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয় সবকিছুই আমাদের রয়েছে। আমাদের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার ও সক্ষমতা রয়েছে।’
মাইকেল ও’হ্যানলন মনে করেন, চীন বা উত্তর কোরিয়াকে প্রতিহত করার সক্ষমতা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এই সক্ষমতা কমে যেতে পারে। সেই পর্যায়টি ঠিক কোথায়, তা হয়তো আমরা জানতে পারব না। কারণ, এটি মূলত শত্রুর মনস্তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে।’
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- অস্ত্র