জাপানকে যেভাবে গুপ্তচরদের আস্তানা বানিয়েছেন পুতিন
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধান
ওয়াগনার প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানির নিহত যোদ্ধাদের স্মরণে তৈরি করা স্মৃতিসৌধের একটি পতাকায় ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিকৃতি। সম্প্রতি মস্কোতে। ছবি: এএফপি
এএফপি ও জাপান টাইমস
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১৬:১৩ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১৬:১৮
আইনি দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে জাপানকে ‘গুপ্তচরদের আস্তানা’ বানিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে টোকিও হয়েছে অস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরির প্রধান উৎস। এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
টাইমসে রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য সামরিক ও বেসামরিক উভয়ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সংগ্রহ ও গোয়েন্দা তথ্য জোগাড়ের জন্য জাপানের ভূখণ্ড ব্যবহার করছে রাশিয়া। এক্ষেত্রে দেশটির ‘গুপ্তচরবৃত্তি সংক্রান্ত দুর্বল আইন’-এর সুযোগ কাজে লাগানো হচ্ছে।
প্রতিবেদনে ইউক্রেন সরকারের একটি হিসাবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলোর ৯০ শতাংশেই জাপানি যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়। দেশটিতে রাশিয়ার এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন মাক্সিম ভ্লাদিমিরোভিচ ফিলচেনকভ নামের এক রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি রুশ বিমান সংস্থা এরোফ্লট-এর টোকিও কার্যালয়ে ছদ্মবেশে কর্মরত আছেন।
নিউইয়র্ক টাইমস আরও লিখেছে, রাশিয়ায় সরাসরি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। এ কারণে জাপান থেকে সংগৃহীত যন্ত্রাংশগুলো মস্কোয় পাঠাতে ভিয়েতনাম, উজবেকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো তৃতীয় দেশ এবং মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কাজ করছে যন্ত্রাংশ সংগ্রহকারী একটি নেটওয়ার্ক।
টাইমসের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সোমবার বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন জাপান সরকারের প্রধান মুখপাত্র মিনোরু কিহারা। প্রতিবেদনের বিষয়ে সরাসরি কিছু উল্লেখ না করে তিনি বলেন, বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা আরও কার্যকরভাবে প্রতিহত করা প্রয়োজন।
কিহারা বলেন, ‘আমরা স্বীকার করছি যে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা জাপানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এগুলো প্রতিরোধ করার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।’
জাপান সরকারের এই মুখপাত্র বলেন, টোকিওকে আরও বেশি কঠোরতার সঙ্গে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। বিচ্ছিন্ন বা খণ্ড খণ্ড গোয়েন্দা কার্যক্রমগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে পার্লামেন্টে একটি আইন অনুমোদন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি নতুন জাতীয় সংস্থা গঠনের পথ সুগম হয়েছে।
গুপ্তচরদের গন্তব্য জাপান
নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি জাপানি গণমাধ্যম ‘দ্য জাপান টাইমস’ও প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রুশ সেনা অভিযানের পরপরই, পশ্চিমা নেতারা তাদের দেশ থেকে শত শত রুশ গুপ্তচরকে বহিষ্কার করেন। একই সঙ্গে ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোম্পানিগুলো কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।
মূলত ক্রেমলিনের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং মাইক্রোচিপ, ট্রান্সমিটার ও অস্ত্র তৈরির যন্ত্রপাতির মতো সরঞ্জাম কেনা কঠিন করে তোলার লক্ষ্যেই ওই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কর্মকর্তারা বলছেন, এরপর থেকে বহিষ্কৃত সেই গুপ্তচরদের বেশ কয়েকজনকে এমন একটি দেশে দেখা গেছে, যা তাদের ধারণাতেও ছিল না। সেই দেশটি হলো- জাপান।
টোকিওতে এই গুপ্তচরদের কার্যক্রমের মূলে আছে রুশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন ইউনিট। এটি ‘২০তম ডিরেক্টরেট’ নামে পরিচিত। পাঁচটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, এই ইউনিটের কর্মকর্তারা কূটনীতিক বা ব্যবসায়ী সেজে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তি কেনা এবং সেগুলো রাশিয়ায় পাচার করার কাজ করছেন।
ধ্বংসস্তূপ থেকে অনুসন্ধান শুরু
গত মে মাসে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের একটি ভবনে আঘাত হানে রাশিয়ার ‘কেএইচ-১০১’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এতে অন্তত ২৪ জন নিহত হন। এরপর কিয়েভের তদন্তকারীরা ভবনটির ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান শুরু করেন। পরে এ সংক্রান্ত একটি মূল্যায়নে উল্লেখ করেন, ক্ষেপণাস্ত্রটি পরিচালনায় জাপানি যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছিল।
ওই ঘটনার পর ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশের সঙ্গে জাপানের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন নিউইয়র্ক টাইমস। এ কাজে গোপন সরকারি নথি, কর্পোরেট রেকর্ড এবং তিনটি মহাদেশের বেশ কয়েকজন গোয়েন্দা ও সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। জনসমক্ষে গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশের অনুমতি না থাকায় অধিকাংশ কর্মকর্তাই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
নথিপত্র ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জাপানের কাছে একটি প্রমাণপত্র পেশ করেছেন। এতেও রুশ অস্ত্রে জাপানি প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা আছে। জাপান সরকার ইউক্রেনের প্রতি জোরালো সমর্থন প্রকাশ করলেও, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ধীরগতি দেখিয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ীদের তৈরি করা কিছু বাধ্যবাধকতার কারণে জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল। ফলে দেশটি বহু আগে থেকেই গুপ্তচরদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। এমনকি জাপানের নিজস্ব কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাও নেই।
টোকিওতে এক গুপ্তচরের আগমন
ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রায় ২ বছর পর ২০২৪ সালে উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রাংশের ঘাটতিতে পড়ে রাশিয়া। ওই সময় ড্রোন ব্যবহার করে রণক্ষেত্রে অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল ইউক্রেন। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে টোকিওতে যাওয়ার দায়িত্ব পান মাক্সিম ভ্লাদিমিরোভিচ ফিলচেনকভ।
ফিলচেনকভ রুশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ-এর একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। ব্যবসায়িক রেকর্ড ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, ফিলচেনকভ জাপান থেকে রাশিয়ায় পণ্য পরিবহনকারী লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করেন।
সোভিয়েত আমল থেকেই জিআরইউর গুপ্তচরেরা পশ্চিমা প্রযুক্তির সন্ধানে রুশ বিমান সংস্থা ‘এরোফ্লট’-এর চাকরিকে ছদ্মবেশ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। জাপানে বিমান সংস্থাটির কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও এর অংশীদার এখনও সক্রিয়। তাদেরই একটি প্রতিষ্ঠান ‘প্রোকো এয়ার’। শ্রীলঙ্কা ও উজবেকিস্তানের মতো দেশে যাতায়াত করা বিমান সংস্থাগুলোর কার্গো স্পেস ভাড়া নেওয়ার কাজ করে প্রোকো। এরপর এসব দেশ থেকে কার্গো স্থানান্তর করা হয় এরোফ্লটে। যা পরে রাশিয়ায় নেওয়া হয়।
এই প্রক্রিয়াটি এখনও বৈধ। কারণ অংশীদারত্বের কারণে কিছু পণ্য এখনও রাশিয়ায় পাঠানোর অনুমতি আছে। আর সে কাজ করায় প্রোকো এয়ার নিজেদেরকে ‘জাপান ও রাশিয়ার মধ্যকার সেতু’ হিসেবে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। এই প্রক্রিয়ায় ফিলচেনকভের সঙ্গে পরিচিত হওয়া মিকি নামে এক জাপানি নাগরিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে টাইমস। তবে তিনি নিষিদ্ধ কোনো পণ্য রাশিয়ায় পাঠানোর কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, এসব পণ্যের বেশিরভাগই চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অল্প কিছু প্রসাধন সামগ্রী।
প্রমাণ হিসেবে মিকি সাম্প্রতিক একটি এয়ার বিলের কপি দেখিয়েছেন। যেখানে কালো কালিতে ‘আর-ফার্ম’ শব্দটি অস্পষ্ট করা। মস্কোর ওষুধ কোম্পানি আর-ফার্মের প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সেই রেপিক প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ। তিনি বিভিন্ন সময় পুতিনের যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সহায়তার কথা বলেছেন।
কিয়েভের চিঠি
বিদেশি সরকারগুলো বারবার জাপানকে সতর্ক করেছে যে তাদের প্রযুক্তি রাশিয়ায় পাচার করা হচ্ছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ইউক্রেন জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত আটটি কূটনৈতিক চিঠি পাঠায়। বার্তাগুলোতে রুশ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামাদিতে জাপানি যন্ত্রাংশের উপস্থিতির তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হয়।
ইউক্রেনের এক কর্মকর্তার মতে, চিঠিগুলোতে উদ্ধার হওয়া ডজন খানেক জাপানি যন্ত্রাংশের তালিকা ও ছবি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সার্কিট বোর্ড, ট্রান্সমিটার ও সেমিকন্ডাক্টর ছিল। টাইমস-এর সাংবাদিকরা তেমন একটি চিঠি পর্যালোচনা করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রেও জাপানি যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে।
জাপানের সবচেয়ে বড় কিছু কোম্পানি- যেমন নিপ্পন ইলেকট্রিক করপোরেশন, প্যানাসনিক, তোশিবা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা যন্ত্রাংশ উদ্ধারের তালিকাও জাপানের কাছে হস্তান্তর করেছে ইউক্রেন। তবে এসব নথিতে কোম্পানিগুলোর পক্ষে জেনেশুনে রাশিয়ায় পণ্য পাঠানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো তৃতীয় কোনো দেশ থেকে পুনর্বিক্রি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সবকটিই কোনো ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছে। নিপ্পন জানিয়েছে, ইউক্রেন যেসব ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশ শনাক্ত করেছে সেগুলো বেশ পুরোনো এবং কোম্পানিটি অনেক বছর আগে সেগুলো বিক্রি বন্ধ করেছে। রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফিলচেনকভের মন্তব্য জানতেও তাঁর টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট ও ইমেইলে বার্তা পাঠায় টাইমস। তবে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি।
(এই প্রতিবেদনে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানের অংশটুকু দ্য জাপান টাইমস থেকে নেওয়া। যা সংক্ষেপে অনুবাদ করা হয়েছে)