যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
যুদ্ধের বিস্তৃতি বাড়ছে ঝুঁকিতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও নিরাপত্তা
হুতিদের নৌ অবরোধে যুদ্ধে নতুন ফ্রন্ট খোলার শঙ্কা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার বিস্তৃতি বাড়ছে। টানা দশম রাতের মতো মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলা এবং জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুতিদের ঘোষিত নৌ অবরোধ যুদ্ধকে নতুন ফ্রন্টে টেনে আনছে। আবার উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামোয় তেহরানের একের পর এক আঘাত সংঘাতকে এক চরম অনিশ্চিতায় ঠেলে দিচ্ছে। ফলে আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে পরিস্থিতি দ্রুত এক জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। খবর সিএনএন ও আলজাজিরার।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরে সরাসরি হামলা না চালিয়ে কৌশলে সংঘাতের পরিধি নিয়ন্ত্রণ করছে। লেবাননের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইলিয়াস হান্না পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রভিত্তিক সামরিক সম্পদে সরাসরি আঘাত হানা কঠিন এবং তা করলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত বিধ্বংসী পাল্টা হামলা আসবে।
তবে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে আক্রমণের পেছনে তেহরানের পৃথক যুক্তি রয়েছে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আতিফেহ তাগিয়ানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানগুলো পরিচালনায় কুয়েতসহ প্রতিবেশী দেশের ঘাঁটি ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যে ভূখণ্ড থেকে হামলা পরিচালিত হয়, সেখানে পাল্টা আঘাত হানার অধিকার ইরানের রয়েছে।
অন্যদিকে, কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-শায়জি এই যুক্তিকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, মার্কিন হামলাগুলো মূলত পারস্য উপসাগরে থাকা জর্জ ডব্লিউ বুশ ও আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এসব রণতরীতে আঘাত করে একজন মার্কিন সেনা নিহত হলেও পরিণতি ভয়াবহ হবে। ইরান সেই ভয়েই মার্কিন নৌবহর এড়িয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
তবে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বন্দর আল-ওতাইবি জানান, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান– কোনো পক্ষই আপাতত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে যেতে চায় না। ইরান মূলত আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির জন্য হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক অবকাঠামোকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। গত সোমবার ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের মালিকানাধীন বা সে দেশের বন্দর অভিমুখে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। ওই দিনই হামলা এড়াতে চীনা ও ভারতীয় তেলবাহী দুটি সৌদি ট্যাঙ্কার লোহিত সাগর থেকে পথ ঘুরিয়ে সুয়েজ খালের দিকে রওনা দেয়। হুতিদের এই হুমকি ইরান যুদ্ধে আরেকটি ফ্রন্ট খোলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজগুলোর বীমা মাশুল এক লাফে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলছে।
পাশাপাশি, কৌশলগত হরমুজ প্রণালি আগে থেকেই অবরুদ্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রধান বাণিজ্যিক রুটগুলো স্থবির হয়ে পড়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ অন্তত ৬০ শতাংশ ব্যাহত হচ্ছে, যার জেরে ফিলিপাইনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য ও জ্বালানি ব্যবস্থায় এই অস্থিরতা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, গত সোমবার টানা দশম রাতের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানে জোরালো বিমান হামলা চালিয়েছে। জবাবে গতকাল মঙ্গলবার বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কুয়েত ও বাহরাইনের বেসামরিক বিমানবন্দর, পানি পরিশোধন ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, কুয়েতে হামলায় মার্কিন বাহিনীর দূরপাল্লার রাডার, প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র এবং একাধিক এমকিউ-৯ ড্রোন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল নিশ্চিত করেছেন, ৭ জুলাই সংঘাত নতুন করে শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, প্রত্যেক সেনা মৃত্যুর জন্য ইরানকে বহু গুণ চড়া মূল্য দিতে হবে। এর মধ্যেই ওমানের মাসকাট বৈঠকে ১১ জুলাই উত্থাপিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি রূপরেখা নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে এখনও ওয়াশিংটন বা তেহরানের কাছ থেকে চূড়ান্ত সংকেত মেলেনি।
এরই মধ্যে ইরানের সম্ভাব্য পরমাণু সেন্ট্রিফিউজ ঘাঁটিতে খুব দ্রুতই জোরালো হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইরান সেন্ট্রিফিউজ গোপন জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে কিনা। তখন তিনি বলেন, তাদের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো হবে, কিন্তু তারা পাল্টা হামলার সক্ষমতা রাখে না। ট্রাম্প আরও বলেছেন, ধ্বংসের মুখে পড়া ইরান এখন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার টেবিলে বসতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে তারা আলোচনার জন্য উপযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আলাপে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আগ্রহ নেই বলে জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
- বিষয় :
- ইরান যুদ্ধ
- হুতি
- হুতি বিদ্রোহী
- ইয়েমেন
- জ্বালানি