আগামীকাল যেন ঘুম থেকে না উঠি—ইরান যুদ্ধে পাঠানো মার্কিন রণতরির ৫ হাজার নাবিক মানসিক চাপে
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের হ্যাঙ্গার বে-তে একটি এফ/এ-১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ করছেন নাবিকেরা। ছবি: মার্কিন নৌবাহিনী
দ্য গার্ডিয়ান
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০৫ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৪৮
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানে সহায়তা করতে প্রায় নয় মাস ধরে সাগরে রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। দীর্ঘ সময় ধরে বন্দরে না ফেরায় জাহাজটির প্রায় ৫ হাজার নাবিকের জীবনযাপন ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য ও সামরিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সান দিয়েগোভিত্তিক বিমানবাহী রণতরিটি গত বছরের ২১ নভেম্বর বন্দর ছাড়ে। শুরুতে এর গন্তব্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। পরে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হলে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়। এরপর টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় উল্লেখযোগ্য কোনো বন্দরে না থেমে সাগরে রয়েছে জাহাজটি। কয়েক দফায় এর মোতায়েনের সময়ও বাড়ানো হয়েছে।
এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
এর আগে নেভি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর প্রতিবেদনে জাহাজটিতে পানি ও বিভিন্ন সরঞ্জামের ঘাটতি, পাইপলাইনের সমস্যা, কর্মীদের মনোবল কমে যাওয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কথা বলা হয়। এমনকি কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব খবরের পর কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা পেন্টাগনের কাছে জবাব চেয়েছেন।

সম্প্রতি এ উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত টাউন হল সভায় নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে তাঁরা এ ক্ষোভ উগরে দেন। সভায় উপস্থিত দুই নাবিকের স্ত্রী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সান ডিয়েগোর ওই সভায় আনুমানিক ২০০ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অংশ নেওয়া এক নাবিকের স্ত্রীর ভাষ্য, সভার দিনই তিনি তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটি বার্তা পান। অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি কর্মকর্তাদের জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে লিখেছেন যে ‘তিনি আশা করেন আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে।’
ওই নারী আরও জানান, সভায় উপস্থিত নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সুনির্দিষ্ট বা আবেগঘন বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি। তবে জাহাজে থাকা নাবিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক) এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন তারা।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপিত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য, প্রতিটি জাহাজ ও নাবিককে প্রয়োজনীয় সবকিছু দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সাবেক নৌ কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় জাহাজে অবস্থান করা এবং বন্দরে যাওয়ার সুযোগ না পাওয়া নাবিকদের ওপর বড় ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
২০০৫ সালে আব্রাহাম লিংকনে দায়িত্ব পালন করা সাবেক নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন আরমেন কার্দিয়ান জাহাজটিকে প্রায় ৫ হাজার মানুষের একটি ‘ভাসমান শহর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এত মানুষের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার বেলার খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। পাশাপাশি জাহাজে ছোটখাটো যান্ত্রিক ও পাইপলাইনের সমস্যা থাকাও স্বাভাবিক।
তবে দীর্ঘ সময় স্থলভূমিতে পা রাখতে না পারার বিষয়টি তাকে বেশি চিন্তিত করেছে। কার্দিয়ান বলেন, দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার কারণে মানুষের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়।
এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের নজির অবশ্য এর আগেও দেখা গেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ৩২৬ দিনের মোতায়েন শেষে দেশে ফেরে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সেটিই ছিল কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরির দীর্ঘতম মোতায়েন। ওই সময় জাহাজটিতে আগুন লাগা এবং খাবারের সংকট নিয়েও অভিযোগ উঠেছিল।
আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো তাই শুধু জাহাজের রসদ বা কারিগরি সমস্যার প্রশ্ন নয়; দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।
- বিষয় :
- মধ্যপ্রাচ্য
- রণতরি
- যুক্তরাষ্ট্র
- ইরান
- ইরান যুদ্ধ
- মানসিক চাপ