যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক হুমকিতে ইরানের হুঁশিয়ারি
এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হবে না
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৫:১৫
ইরানের বাণিজ্য অংশীদারদের লক্ষ্য করে সর্বকালের সবচেয়ে বড় আর্থিক আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি নাকচ করে দিয়েছে। উল্টো যদি অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলে তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সব ধরনের তেলের আমদানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা। দেশটি বলেছে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হবে না।
পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তাদের অনুমতি ছাড়া জাহাজ পার না হওয়া-সংক্রান্ত নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তারা। সবমিলিয়ে ৪৫টি জাহাজ তাদের নীতিমালা ভেঙেছে বলেও উল্লেখ করেছে তারা। এসব যখন ঘটছে, ঠিক সে সময়টিতেই তেহরানে মধ্যস্থতার জন্য সফর করছেন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান আসিম মুনির। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরও হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার জন্য আজ মঙ্গলবার ইরান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর বলছে, মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে কিছু আর্থিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ১৯৭৯ সালের পর থেকেই দেশটি ক্রমাগত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। গত রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে বেসেন্ট লিখেছেন, ‘ভোর থেকে অর্থনৈতিক ডি-ডে শুরু হতে যাচ্ছে। এটি হবে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে বৃহৎ আর্থিক আক্রমণ।’ বেসেন্টের ঘোষণার পরপরই ডলারের বিপরীতে ইরানের রিয়ালের সর্বোচ্চ দর পতন হয়েছে। খোলাবাজারে এক ডলারের দাম গিয়ে ঠেকে ২০ লাখ রিয়ালে।
পাকিস্তানের সামরিক প্রধান আসিম মুনির গতকাল সোমবার তেহরানে আলোচনার জন্য পৌঁছান। ইরানের গণমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে বিষয়টি। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আসিম মুনিরের সফর আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রচারের প্রচেষ্টার অংশ। এক পাকিস্তানি সূত্র জানায়, এবারের সফরে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে মুনিরের।
পাকিস্তানের দুই সূত্র জানায়, ট্রাম্প মুনিরকে গত সপ্তাহে ফোন করেছিলেন। আরেক সূত্র জানায়, ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস এ প্রসঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ও ইরানের সামরিক বাহিনী গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একে অন্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। তবে সর্বশেষ জুনে তারা যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় বসেছিল। এর মধ্যে দুই দেশের আর কোনো আলোচনাও হয়নি। এ সময়ের মধ্যে একাধিকবার হরমুজ প্রণালিতে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
সৌদি আরবের লোহিত সাগর বন্দরের কাছে ট্যাঙ্কারে হামলা
গতকাল সোমবার সৌদি আরবের বন্দর শহর ইয়ানবু থেকে পশ্চিমে এক ট্যাঙ্কারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এতে জাহাজের মূল ডেকে আগুন ধরে যায়। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানায় এসব তথ্য। তবে ঠিক কে হামলা চালিয়েছে, তা এখনও জানা যায়নি। ইরানের হুতি মিত্ররা গত মাসে জানায়, হরমুজ এড়িয়ে সৌদি আরব যেসব তেল রপ্তানি লোহিত সাগরের মাধ্যমে করছে, সেগুলোকে আটকানো হবে।
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। বিশেষ করে ইরান ও লেবাননে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়ে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে স্থবির করে দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তেল ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে চাপ তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। যুদ্ধের অন্যতম প্রধান একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কথা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চেয়েছিল সেটির অবসান ঘটাতে। তবে বর্তমানে সেটির কী অবস্থা, তা এখনও অস্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র গতকাল সোমবার জানায়, দুই সপ্তাহ দাম বাড়ার পর গত সোমবার তেলের দাম কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী বেসেন্ট সুনির্দিষ্টভাবে নিজেদের পরিকল্পনার কথা জানাননি। তবে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেসব দেশকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে, যারা ইরানের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের জড়িয়েছে। বেসেন্ট ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে লিখেছেন, ‘তাদের এটি চালিয়ে যাওয়ার পরিণতি সম্পর্কে ভাবা উচিত।’
রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর আগে একাধিক বিবৃতিতে বড় সামরিক প্রতিক্রিয়ার কথাও উল্লেখ করেছে তারা। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ে গত রোববার বলেন, ‘যদি অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলমান থাকে, তাহলে এক বিন্দু তেলও রপ্তানি হবে না। না হরমুজ প্রণালি দিয়ে, না পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো স্থান দিয়ে।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘ইরান এই যুদ্ধে যে কোনো দেশের অংশগ্রহণ বা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে সমর্থনের বিষয়টিকে যুদ্ধে জড়ানো হিসেবে দেখবে।’
নিষেধাজ্ঞা ও চাপ কাজ করবে না: চীন
এদিকে, চীন বলেছে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও চাপ কাজ করবে না। এর আগে চীনের কাছে সহায়তা চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি চেয়েছিল, তারা যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর চাপ তৈরিতে সহযোগিতা করে। চীন বহু বছর ধরে ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। তবে চলতি বছরের মধ্য জুলাই থেকে ইরানের বন্দরে অবরোধ দেওয়ার কারণে চীনে ইরানের তেল যাওয়ার প্রবাহ বিঘ্নিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হুমকি সামনে আসার পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ও চাপের কৌশল সহায়তা করবে না এবং বেইজিং চীনের স্বার্থ রক্ষায় যা যা করার করবে।
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- তেল