ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফুটেজও দেখানো হচ্ছে না: তিব্বতের বন্যা নিয়ে চীনে কী ঘটছে

ফুটেজও দেখানো হচ্ছে না: তিব্বতের বন্যা নিয়ে চীনে কী ঘটছে
×

তিব্বতের গিরং বন্দরের কাছে উদ্ধার অভিযান চলার সময় ওড়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা। গত শুক্রবার। ছবি: এএফপি

বিবিসি

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:২৩ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৩৮

সিসিটিভিতে ধারণ হওয়া তিব্বতের গিরং বন্দরের সেই ভিডিওটি এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রচণ্ড গতির স্রোত সাদা রঙের একটি ভবনকে চাপা দিচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছে সেখানে থাকা মানুষ। সামাজিক মাধ্যমের বদৌলতে ভিডিওটি দ্রুতই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে, কেবল চীন ছাড়া। 

দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গণমাধ্যমে শুধু বন্যার একটি স্থিরচিত্র সম্প্রচার করা হয়েছে। দুর্যোগটির বিভিন্ন দিক নিয়ে অনলাইনে আলোচনা হলেও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেটে গিরং বন্দরের পুরো ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। তার চেয়েও বেশি কঠিন বেঁচে যাওয়া কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা জানা। 

গত বুধবারের বন্যায় তিব্বতে উল্লেখযোগ্য হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অনেকে এখনও নিখোঁজ। তাদের উদ্ধারে বেইজিং বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্ধার তৎপরতায় সমন্বয় করতে কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। তবে হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য খুবই কম জানা যাচ্ছে।

তিব্বতের গিরং বন্দরে পাহাড়ি ঢলের আঘাত। গত বুধবার। ছবি: সংগৃহীত

কারণ হিসেবে সামনে আসছে তিব্বতের ওপর বেইজিংয়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। ১৯৫০-এর দশকে চীন তিব্বতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর থেকে অঞ্চলটি ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির শাসনের বিরোধিতা করে আসছে। বছরের পর বছর সেখানে বিক্ষোভ দমন করা হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে তা ছিল সহিংস উপায়ে। নির্বাসিত আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামাকেও বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

এমন ইতিহাসের কারণে যেকোনো বড় ঘটনার সময় তিব্বত ঘিরে বেইজিংয়ের স্পর্শকাতরতা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চীনা কর্তৃপক্ষ তিব্বতে নিখোঁজ ও নিহতদের সংখ্যা প্রতিদিন হালনাগাদ করছে। পাশাপাশি উদ্ধার অভিযান এবং হ্রদের পানি উপচে পড়ার ঝুঁকিতে নিয়ে তথ্য প্রকাশ করছে। তবে এর বাইরে বিস্তারিত জানার সুযোগ খুবই কম। সেখানে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য নেই। প্রাণঘাতী বন্যার সময় বা এরপরের পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণ করা কোনো ভিডিও ইন্টারনেটে নেই বললেই চলে।

বেইজিং থেকে বিবিসির সাংবাদিক লরা বিকার জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের বক্তব্য এখনও জানা যায়নি। তিনি উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়েও সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু তিব্বতের রাজধানী লাসায় কারও সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করাটা পিংয়ইয়ংয়ের চেয়েও কঠিন মনে হচ্ছে।

গিরং বন্দরের কাছে উদ্ধার অভিযান। শনিবার তিব্বতে। ছবি: এএফপি

সরকারের অনুমতি ছাড়া বিদেশি সাংবাদিকেরা তিব্বতে যেতে পারেন না। এ ধরনের বড় কোনো ঘটনা ঘটলে ভিডিও সরিয়ে ফেলা হয়। এর আগে তথ্য সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকদের হাতে খুব কম সময় থাকে। ফলে তথ্যের জন্য নির্ভর করতে হয় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত উদ্ধার তৎপরতার খবরেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল পাহাড় ও খাড়া পর্বত বেয়ে উঠছে, কিংবা উত্তাল নদী পেরিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এরপর কী ঘটেছে, কিংবা তারা কাদের উদ্ধার করতে পেরেছে- তা এখনও জানা যাচ্ছে না।

গত বৃহস্পতিবার বিশ্ব গণমাধ্যমে যখন ভয়াবহ বন্যার তথ্য প্রচার হচ্ছিল, তখন চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের প্রধান বুলেটিন শুরু হয় শি জিনপিংয়ের নতুন বই প্রকাশের খবর দিয়ে। বইটি মূলত শির ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কাজগুলোর’ একটি সংকলন।

এর অর্থ এই নয় যে বেইজিং বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। বরং তারা অত্যন্ত চিন্তিত। প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে তাঁকে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়। বড় ধরনের কোনো ট্র্যাজেডির পরপরই দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার এমন সফর চীনে বিরল ঘটনা।

বিবিসিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন। স্ক্রিনশট

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বরাবরই কোনো বিষয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর বেশি জোর দেন। তাঁর দল কমিউনিস্ট পার্টি সম্ভবত এ ধরনের বিপর্যয়ের পর তিব্বতে অসন্তোষ বৃদ্ধির আশঙ্কা করছে। এমন ট্র্যাজেডির সামাজিক প্রভাব নিয়েও দলটি শঙ্কিত হতে পারে। 

দলটির তৎপরতায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পাহাড়ি ঢল নামার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অসন্তোষের যেকোনো লক্ষণ চাপা দিতে তৃণমূল কর্মীদের মাঠে নামায় কমিউনিস্ট পার্টি। স্থানীয় পার্টি অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সদস্যদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। সেখানে নিজ নিজ এলাকায় ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের মানসিক সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিটির মূল বার্তা ছিল- ‘সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।’ নির্দেশনায় বলা হয়, যারা ভালো কাজ করবে তাদের পুরস্কৃত করা হবে, আর যারা ব্যর্থ হবে তাদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে খাবার বিতরণ করেন স্বেচ্ছাসেবীরা। শনিবার গিরংয়ে। ছবি: এএফপি

এটি এমন এক সতর্কবার্তা, যা দলের কেউ সহজভাবে নেওয়ার সাহস পাবে না। অধিকারকর্মীদের মতে, ওই অঞ্চলের তিব্বতিরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললে বা সরকারের প্রচারণার বিপরীতে অনলাইনে কিছু পোস্ট করলে গ্রেপ্তার বা আটক হতে পারেন। আর এ কারণেই সেখানকার খোঁজ জানা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিব্বত (আইসিটি) নামের একটি সংস্থা উদ্ধারকর্মীদের কাজের প্রশংসা করেছে। তবে তারা অভিযোগ তুলেছে, বেইজিং সামাজিকমাধ্যম থেকে বিভিন্ন ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য মুছে ফেলছে। সংস্থাটি চীনা কর্তৃপক্ষকে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের প্রকৃত তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।

তিব্বতিদের জীবনযাত্রা কেমন, জানতে গত বছর হিমালয়ের পাদদেশের একটি শহরে গিয়েছিল বিবিসি। ওই শহরটি চীন স্বীকৃত তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ঠিক বাইরে অবস্থিত। সেখানে একটি মঠের ভিক্ষুদের সঙ্গে কথা বলেন বিবিসির সাংবাদিকরা। এক ভিক্ষু তখন তিব্বতিদের মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিতের কথা জানিয়েছিলেন। তবে বেইজিং তিব্বতিদের অধিকার লঙ্ঘনের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

(বিবিসিতে প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনের শিরোনাম আংশিক পরিবর্তন করা হয়েছে।)

আরও পড়ুন

×