ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপাল ট্র্যাজেডি

ছেলের খোঁজে এক বাবা সুদে ঋণ নিয়েছেন, হেঁটেছেন বহুদূর

ছেলের খোঁজে এক বাবা সুদে ঋণ নিয়েছেন, হেঁটেছেন বহুদূর
×

কাঁধে ব্যাগ নিয়ে নেপালের পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে ছেলের খোঁজ করছেন টালকা সদা। ছবি: স্মিতা শর্মা/আল জাজিরা

আল জাজিরা

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:১৭ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:২৬

টালকা সদার চোখেমুখে ক্লান্তি ও বিষাদের ছাপ স্পষ্ট। নেপালে কয়েক মাইল পাহাড়ি পথ হেঁটে পায়ের গোড়ালিও ব্যথায় জর্জরিত। তিনি ক্ষুধার্ত, একইসঙ্গে ক্ষুব্ধ। তবুও ছেলের সন্ধান পাওয়ার আশা ছাড়েননি।

প্রায় ৫০ বছর বয়সী সদা নেপালের তরাই অঞ্চলের জেলা সপ্তরীর বাসিন্দা। সমতলভূমির এই জেলাটি ভারত সীমান্তের কাছে অবস্থিত। গত ২৬ আগস্টে বন্যার পর থেকে সদার একমাত্র ছেলে বিনোদ (১৯) নিখোঁজ। তিনি রাসুয়া জেলার একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিকের কাজ করছিলেন।

বিনোদের সঙ্গে ওই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে ১৭ থেকে ১৯ বছর বয়সী আরও চার কিশোর-তরুণ ছিল। তাদেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। চোখের পানি মুছতে মুছতে সদা বলেন, ‘আমার স্ত্রী কতটা আহাজারি করছে, তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। আমার বুকটাও ফেটে যাচ্ছে। কী করব বুঝতে পারছি না।’

হেঁটে বহুদূর
সদার সঙ্গে যখন কথা হয় তখন তাঁর পরনে ছিল মলিন হয়ে যাওয়া সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কমলা রঙের পলিথিনের ব্যাগকে রেইনকোট বানিয়েছেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর এক ভাই।

প্যান্টের পকেটে একটি ময়লা রুমালে ২ হাজার নেপালি রুপি ভাঁজ করে রেখেছিলেন সদা। সেটি বের করে দেখিয়ে বলেন, ছেলের খোঁজে বের হওয়ার খরচ হিসেবে তিনি এই টাকা ধার করেছেন। প্রতি ১০০ রুপির জন্য তাঁকে ২০ রুপি করে সুদ দিতে হবে।

এই ধারের টাকায় ভাইকে নিয়ে সপ্তরী থেকে রাজধানী কাঠমান্ডু যান সদা। বাসে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে তাদের ৯ ঘণ্টা সময় লেগেছে। বন্যার পর অনেক ভুক্তভোগীকে বিমানে করে কাঠমান্ডুতে আনা হয়েছে। তাই প্রথমে তাঁরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে গিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষ কিংবা লাশের তালিকায় বিনোদকে খুঁজেছেন।

মর্গের বাইরে মৃত ব্যক্তিদের যেসব ছবি টানানো হয়েছে, সেগুলো দেখে কাউকে শনাক্ত করা বেশ কঠিন। কারণ উদ্ধার হওয়া বেশিরভাগ মরদেহের চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে। সেই ছবিগুলোর ভিড়েও সদা তাঁর ছেলেকে খুঁজেছেন, কিন্তু পাননি।

ভাইয়ের সঙ্গে টালকা সদা। ছবি: আল জাজিরা

এরপর কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের জেলা নুয়াকোটের দিকে হাঁটা শুরু করেন সদা। এই জেলাটি বিনোদের কর্মস্থলের সবচেয়ে কাছে। ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটার পর তাঁরা ত্রিশূলী শহরে পৌঁছান।

সদা বলেন, ‘গত রাতে এখানে পৌঁছানোর পর একটি লজে থাকার জন্য ১ হাজার ৫০০ নেপালি রুপি নিয়েছে। তারা আমাদের মাত্র এক বাটি ভাত দিয়েছিল। সেটি খেয়ে ক্ষুধা মেটেনি। এখানে যদি আরো একরাত থাকতে হয়, তাহলে বাকি টাকা শেষ হয়ে যাবে। তখন বাড়ি ফেরার জন্য হাতে কিছুই থাকবে না।’

অসহায়ত্ব ও ক্ষোভ
ভাইয়ের সঙ্গে মিলে সদা অসংখ্যবার ছেলের মোবাইল নম্বরে কল দিয়েছেন। কিন্তু সাড়া পাননি। সদা বলেন, ‘আমরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। তাঁর কণ্ঠও শুনতে পাচ্ছি না। বাড়িতে সবাই ভেঙে পড়েছে। আমার স্ত্রী ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে বলেছে। আমরা সব জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে খুঁজছি। কিন্তু তাঁকে কোথায় পাব, কেউ বলতে পারে?’

যখন কিছুই করার থাকে না, মানুষ তখন অলৌকিক কিছু ঘটার আশায় বুক বাঁধে। সদার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিনি কল্পনা করছেন, বিনোদ বয়সে তরুণ। দিনমজুরের কাজ করেছে। বন্যার সময় নিশ্চয় দৌড় দিয়ে কোথাও আশ্রয় নিয়েছে।

কিন্তু পরমুহূর্তেই সদার কণ্ঠে অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমার আর কোনো আশা নেই। বিনোদ যদি বেঁচে থাকত, তাহলে নিশ্চয় কোনো একটা ব্যবস্থা করে ফোন করতো।’

সদার এখনো হাল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অন্তত ছেলের কর্মস্থলে না পৌঁছানো পর্যন্ত। তাই দুই ভাই মিলে বিনোদের জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে রওনা দেন। 

যাওয়ার সময় সদা চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘কেউ যদি আমাদের কথার জবাব না দেয়, সাহায্য না করে, তাহলে থানায় আগুন ধরিয়ে দেব।’ সদার ওই চিৎকার তখন এক অসহায় বাবার ক্ষোভ ও হুঁশিয়ারির মতো শোনাচ্ছিল।

সংশ্লিষ্ট খবর

আরও পড়ুন

×