এক্সপ্লেইনার
সময়ের সঙ্গে পাল্লা: নেপালের টানেলগুলোতে যেভাবে উদ্ধার অভিযান চলছে
রসুওয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতর উদ্ধারকারীরা। সোমবার নেপালের রসুওয়া জেলায়। ছবি: এএফপি
সিএনএন
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৩২ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৫৮
নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলে নিখোঁজ শ্রমিকদের খুঁজে বের করতে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর তীরে থাকা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্তত ৯৩৩ জন শ্রমিক নিখোঁজ আছেন।
বন্যার সময় ওই শ্রমিকদের কতজন টানেলগুলোর ভেতরে ছিলেন তা স্পষ্ট নয়। কতজন জীবিত থাকতে পারেন, সেটিও বোঝা যাচ্ছে না। প্রতিকূল আবহাওয়া, কাদা এবং সড়ক ও সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা জটিল হয়ে গেছে।
হিমালয়জুড়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে নেপালের পাশাপাশি চীন ও ভারত গত কয়েক বছরে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। পাহাড় থেকে প্রবল স্রোতে নেমে আসা নদীগুলোর জ্বালানি সম্ভাবনাকে তারা কাজে লাগাতে চাইছে।
শ্রমিকেরা কোথায়?
নেপালের ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইপিপিএএন) শনিবার প্রকাশিত এক তালিকায় জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৯০০ শ্রমিক নিখোঁজ আছে।

প্রতিটি প্রকল্পই উদ্ধারকারীদের জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য তাদেরকে সবচেয়ে নিরাপদ পথ খুঁজতে হচ্ছে। কোনো কোনো প্রকল্পের টানেল কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে শ্রমিকেরা মূল প্রবেশপথ থেকে অনেক দূরে থাকতে পারেন।
টানেলের ভেতরের কক্ষ ও মজুত সরঞ্জাম আটকে পড়া শ্রমিকদের বেঁচে থাকার জন্য সহায়ক হতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে দেখলে ভেতরে কয়েক সপ্তাহের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মজুত আছে। তবে পর্যাপ্ত বাতাসের অভাবকে সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আইপিপিএএন-এর তালিকা অনুযায়ী, ‘ত্রিশূলী-৩এ’ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪২ জন নিখোঁজ আছেন। সেখানে বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের খুঁজতে একটি গর্ত করে ভেতরে প্রবেশের জন্য ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে। ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে যাওয়ার টানেলের দৈর্ঘ্য ৪ কিলোমিটারের বেশি। বন্যা আঘাত হানার সময় সেখানে কয়েক ডজন শ্রমিক কাজ করছিলেন।
ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্ধারকারীদের পরামর্শ দিচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার ভূতত্ত্ববিদ আর্নল্ড ডিক্স। তিনি বলেন, টানেলের কতটা অংশ কাদা বা পানিতে ভরে গেছে তা স্পষ্ট নয়। তাই ১০ মিটার খনন করতে হতে পারে, আবার ১০০ মিটারও খনন করতে হতে পারে।

ডিক্স বলেন, ঝুঁকির আরও অনেক বিষয় আছে। জরুরি ‘শাটডাউন’ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করলে টারবাইন কক্ষ পানিতে ভরে যেতে পারে। এতে ভেতরে থাকা যে কেউ ডুবে যাবেন। আবার খননকাজের সময়ও পানি বেরিয়ে আসতে পারে। তখন সেটি উদ্ধারকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
চিলিমে নামের একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে ছয়জন নিখোঁজ আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে যুক্ত জেনজেন লামা সোমবার সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি প্রকল্পটির একটি নকশা শেয়ার করেছেন। এতে দেখা যায়, ২৫০ মিটার দীর্ঘ একটি টানেল ঢাল বেয়ে নিচের দিকে গেছে। পরে এটি একটি বড় স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সেখানে আছে সার্ভিস বে, নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জলবিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার।
রোববার টানেলটি কাদা, পলি ও আবর্জনায় বন্ধ ছিল। জেনজেন লামা বলেন, কোনো কোনো জায়গায় কাদা ও পলি বুক সমান। শেষ পর্যন্ত তারা ১৩০ মিটার পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে থেমে যান। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে সেখানে হেলিকপ্টার অবতরণ করাও কঠিন।

লামা বলেন, ‘টানেলের ভেতরে রান্নাঘর ও কিছু খাবার আছে। কিন্তু অক্সিজেনের অবস্থা কেমন, তা জানা যায়নি।’ অস্ট্রেলিয়ার ভূতত্ত্ববিদ আর্নল্ড ডিক্সের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে অন্তত ২৭টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।
উদ্ধারকারী দল কী করছে?
নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশের প্রকৌশলী, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে ভারত-চীনের বিশেষজ্ঞরা যোগ দিয়েছেন।
উদ্ধারকারীরা ড্রোনে থার্মাল ক্যামেরা ব্যবহার করে জীবিতদের খোঁজ করছেন। পাশাপাশি টানেলের প্রবেশপথ শনাক্ত করা এবং ভেতরের কাদা সরানোর কাজও চলছে। একই সময়ে উদ্ধারকারীরা সুরক্ষিত টানেলগুলোর ওপরের অংশে গর্ত করে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে উদ্ধারকারীরা যে গর্ত তৈরি করেছেন, সেটিতে দড়ি ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করে ভেতরে নামা যায়। কিন্তু ভেতর থেকে কারও সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপরের অংশ ভেদ করে ভেতরে যাওয়ারও নানা চ্যালেঞ্জ আছে। ডিক্স বলেন, স্টিলের স্তর ভেদ করে টারবাইন কক্ষ পর্যন্ত যেতে বিশেষ সরঞ্জাম প্রয়োজন। ফলে একের পর এক কারিগরি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সোমবার কর্মকর্তারা জানান, পরবর্তী ধাপে উদ্ধারকারীদের অক্সিজেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যোগাযোগের যন্ত্রপাতি এবং ক্যামেরা নিয়ে টানেলের ভেতর পাঠানোর চেষ্টা করা হবে।
বেঁচে যাওয়া শ্রমিকেরা কী বলেছেন
জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্তত ২৭৯ জন শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন কাদা ও পলিতে ভরা টানেল থেকে নিজেরাই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। এখন তারা নিখোঁজ বন্ধু, সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের খোঁজ পাওয়ার অপেক্ষায়।
এমনই একজন শ্রমিক ভক্তি রাম বোহারা ধারণা করছেন, তাঁর কর্মক্ষেত্র ও আশপাশের অন্য প্রকল্পের ১ হাজার শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ১০০ জন বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। নিখোঁজদের মধ্যে তাঁর ভগ্নিপতিও আছেন। তাঁরা একই দলে কাজ করতেন।

রোববার সিএনএনকে ভক্তি রাম বলেন, ‘এখানে কাজ করে আমরা বাড়িতে টাকা পাঠাতাম। আমার বোন অন্তঃসত্ত্বা।’ এ কথা বলার সময় ভক্তি রাম কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ভেতরকার পরিস্থিতি কেমন ছিল সে সম্পর্কে জানা যায় রামচন্দ্র নামে এক শ্রমিকের কাছে থেকে। তিনি যখন বের হচ্ছিলেন তখন পানি, কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ ঢুকছিল। তাই ছাদের লোহার রড আঁকড়ে ধরে তিনি সামনে এগিয়েছেন। টানেলের মুখ পর্যন্ত পৌঁছাতে তাঁর ও সহকর্মীদের ৬ ঘণ্টা লেগেছিল।
কেন এত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প?
হিমালয়জুড়ে বাঁধ, টানেল, মহাসড়ক, রেলপথ ও সেতু নির্মাণে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। চলমান বিপর্যয় এসব কর্মযজ্ঞের ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে। অবকাঠামোগুলো নির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন।

অঞ্চলটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিকম্প ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের পাশাপাশি নেপালও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে। বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার জন্য এখানকার নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশলীদের নজরে ছিল। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিকাশের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় সেই প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুর্যোগের পর আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। বিশেষ করে প্রকল্পগুলোর নকশা, স্থাপনের এলাকা এবং পরিসরের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে অভিন্ন ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।
- বিষয় :
- জলবিদ্যুৎ প্রকল্প
- নেপাল
- উদ্ধার
- অভিযান
- ট্র্যাজেডি