বেতন বাড়ানোর গল্পে বেসরকারিরা কোথায়?
সংগৃহীত ছবি
হুমায়ুন আহমেদ বিলাস
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৩১
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন বাড়িয়ে নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে এই বৃদ্ধি একসঙ্গে কার্যকর হবে না, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দেশের কর্মজীবী মানুষের বড় একটি অংশের অবস্থাটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তাঁরা বেসরকারি খাতে কাজ করেন। তাঁদের আয়, চাকরির নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিশ্চয়তা নিয়েও একইভাবে ভাবতে হবে।
দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বাস্তবতায় সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মানুষের আয় যদি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে কাগজে বেতন বাড়লেও বাস্তবে ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের বড় একটি অংশের চাকরির নিরাপত্তা নেই। অনেককে নিয়মিত কর্মঘণ্টার বাইরে কাজ করতে হয়। আবার যেকোনো সময় চাকরি হারানোর আশঙ্কাও থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয়। ফলে আয় বাড়লেও তা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি জাতীয় বেতনকাঠামো রয়েছে। গ্রেড, মূল বেতন, ভাতা, ইনক্রিমেন্ট ও পেনশন নিয়ে একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা আছে। বেসরকারি খাতে এমন সার্বজনীন কাঠামো নেই। ফলে একই ধরনের যোগ্যতা, দায়িত্ব ও কর্মঘণ্টা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বেতন ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যায়।
বিশেষ চাপের মধ্যে আছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বেসরকারি চাকরিজীবীরা। তাঁদের আয়ের ওপর নির্ভর করে বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, দৈনন্দিন ব্যয় এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয়। আয় যদি এসব ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে প্রতি মাসে তাঁদের আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে।
বিষয়টি বোঝার জন্য খুব জটিল কোনো হিসাবের প্রয়োজন নেই। বছরে কারও বেতন ৫ শতাংশ বাড়ল। একই সময়ে খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় যদি তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, তাহলে বেতন বৃদ্ধির পরও তাঁর প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে। তাই বেতন বৃদ্ধি আর জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এক বিষয় নয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর বিষয়টি মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর ৫ বা ৭ শতাংশ বেতন বাড়ায় বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিলে এই বাস্তবতার কতটা সমাধান হবে, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। সরকার সরাসরি প্রতিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন নির্ধারণ করে দিতে পারে না। একটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, ব্যবসার ধরন ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় বেতন নির্ধারণ করতে হয়। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ওপর একই ধরনের সিদ্ধান্ত হঠাৎ চাপিয়ে দিলে তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপরও পড়তে পারে।
সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকার চাইলে নিয়মিত বেতন পুনর্বিবেচনার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে। মূল্যস্ফীতি একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে বেতন সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন সমন্বয়ের ধারণা বিবেচনা করা যেতে পারে।
এমন একটি ব্যবস্থা কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর হঠাৎ বড় ধরনের চাপ তৈরি না করে ধাপে ধাপে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে কর্মীর আয় এবং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্যও রাখা সম্ভব।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু মাসিক বেতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং অন্যান্য শ্রম অধিকারও একজন কর্মীর আর্থিক নিরাপত্তার অংশ। আয় বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত না হলে একজন কর্মীর জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি আসে না।
অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র বিবেচনায় নিলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব বাজারেও পড়বে। বাড়তি আয় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে, ফলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে পারে। উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে না বাড়লে কিছু পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপও তৈরি হতে পারে। তখন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, যার মধ্যে বেসরকারি চাকরিজীবীরাও রয়েছেন, নতুন চাপের মুখে পড়বেন।
আয়বৈষম্যের বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় যখন কাঠামোবদ্ধভাবে বাড়ছে, তখন বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় যদি একই অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে না বাড়ে, তাহলে দুই শ্রেণির কর্মজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও দৃশ্যমান করবে।
বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে ঘুষের প্রসঙ্গটিও এসেছে। কম বেতন দুর্নীতির অজুহাত হতে পারে না। একজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দায়িত্ব হলো আইন ও বিধি মেনে নাগরিককে সেবা দেওয়া। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সৎভাবে কাজ করাই স্বাভাবিক পথ হয়।
তাই বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা শক্তিশালী করাও জরুরি। ডিজিটাল সেবা বাড়ানো, নগদ লেনদেন কমানো, সরকারি সেবার নির্ধারিত ফি প্রকাশ, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ঘুষের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বেতন বৃদ্ধির সুফল আরও অর্থবহ হতে পারে।
বেসরকারি খাতের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের ভূমিকা মূলত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে এবং কর্মীরাও ন্যায্য আয় ও অধিকার পাবেন। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং একটি ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এক নয়। তাই সবার জন্য একই হারে বেতন বাড়ানোর নীতি বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। কিন্তু এই পার্থক্যকে অজুহাত বানিয়ে কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগও নেই।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো উচিত কি না, তা নিয়ে নয়। একই অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশের অন্য কর্মজীবী মানুষের জন্য রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
একটি দেশের উন্নয়নের সুফল তখনই বিস্তৃত হয়, যখন তা শুধু একটি শ্রেণির আয় বাড়ায় না, বরং সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে কর্মজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিঃসন্দেহে সুখবর। এখন প্রয়োজন বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও সেই সুখবরের একটি বাস্তব পথ তৈরি করা।
হুমায়ুন আহমেদ বিলাস: করপোরেট কমিউনিকেশনস ও জনসংযোগ নিয়ে কাজ করছেন
- বিষয় :
- পে স্কেল