সমকালীন প্রসঙ্গ
সরকারে নতুন পে স্কেল, বেসরকারি খাতে কী
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে বড় করে আপত্তির কিছু নেই। ২০১৫ সালের পর কাঠামোগতভাবে তাদের বেতন বাড়েনি। কিছু ইনক্রিমেন্ট ও প্রণোদনা বেড়েছে কেবল। এর মধ্যে টানা কয়েক বছর বড় মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে সবাইকে। সরকারি কর্মচারী অনেকের বেতন-ভাতা কিন্তু খুবই কম এবং তারা সবাই অসৎ নন। তা ছাড়া সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তাদের মানসম্মত বেতন জোগাতে। সরকারি চাকরিকে আকর্ষণীয় করে রাখার জন্যও এটা জরুরি।
সরকার কিছু ভাতা এ সুবাদে যুক্ত করেছে, যাতে রয়েছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। সরকারি কর্মচারী ও পেনশনারদের মধ্যে অসমতা কমিয়ে আনার প্রচেষ্টাও লক্ষণীয়। মাঝে এই পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। এর প্রধান কারণ সরকারের অর্থ সংকট। তার রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। হালে সরকারি ব্যয় অনেক বেড়েছে জ্বালানি খাতে। বর্তমান সরকারকে শুরু থেকে অপ্রত্যাশিত জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সময়মতো সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
জ্বালানি সংকটের চাপ বেসরকারি খাতে গিয়ে পড়ছে। কলকারখানা পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরও রয়েছে। পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে গোটা অর্থনীতিতেই ধস নামবে বলে ধরে নেওয়া যায়। এ অবস্থায় বেসরকারি খাতে নতুন কাজ সৃষ্টি হওয়া পরে; বিদ্যমান কর্মসংস্থান বহাল রাখাটাই কঠিন। কারখানায় ছুটি চলতে থাকায় অনেক স্থানে শ্রমিকরা বিক্ষোভে নেমেছেন কাজ হারানোর শঙ্কায়। অবস্থা এমন যে, মজুরি বৃদ্ধির দাবির তুলনায় কাজ রক্ষাই যেন জরুরি। এ অবস্থায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও সমাজে তা মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
সরকার অবশ্য ধাপে ধাপে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে সরকারি ব্যয়ে চাপ পড়ে কম। এতে মূল্যস্ফীতির ওপরেও কম চাপ পড়বে বলে প্রত্যাশা। ৩৩ লাখ সরকারি কর্মচারী ও পেনশনারের বেতন বৃদ্ধিতে কোটি কোটি মানুষের বাজারে দাম বৃদ্ধি পেলে সেটা দুর্ভাগ্যজনক হবে বৈ কি। তবে দেশে আগে থেকেই আছে কর্মহীনতা ও কাজ হারানোর প্রবণতা। অর্থাৎ অনেকের হাতে খরচ করার মতো অর্থ নেই। আত্মকর্মসংস্থানে গিয়েও অনেকে মার খেয়েছে। ব্যাংকে জমানো টাকাপয়সা রেখে অনেকে তুলতে পারছেন না। বেসরকারি খাতে অনেকের বেতন কমেছে। মুনাফাও। অর্থাৎ বাজারে অর্থের খুব বেশি সরবরাহ নেই। এ অবস্থায় সরকারি খাত থেকে বাড়তি কিছু অর্থ বাজারে এলে বড় মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হবে– এটা বলা যায় না। এতে বরং একটা ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে যেমন; এ ক্ষেত্রেও তেমনি কিছু বাড়তি ‘কার্যকর চাহিদা’ তৈরি হতে পারে। সেটা কোনো কোনো উৎপাদন খাতের জন্য হয়তো উৎসাহব্যঞ্জক হবে।
একই পরিবারে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে কর্মরত অনেকে আছেন। তারা উভয়ে হয়তো সংসার চালান। এদের একজনের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় সংসার চালাতে এখন সুবিধা হবে। আর বেসরকারি খাতে কর্মরতদের আয় তো সরকার চাইলেই বাড়াতে পারে না। তবে বেসরকারি খাত যেন ভালোভাবে কাজ করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পর সরকারি কর্মচারীরা সেই দায়িত্ব পালনে বেশি করে উদ্যোগী হবেন কিনা– সেই প্রশ্ন রয়েছে। অনেকে বলেন, বেতন বাড়ালে তাদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা কমবে। এটা খুবই সরল প্রত্যাশা। কেননা, দুর্নীতি কমা নির্ভর করে কার্যকর নজরদারির ওপর। বেতন অপরিবর্তিত থাকার সময়ও সরকারের দায়িত্ব রয়েছে তার কর্মচারীদের কাছ থেকে কাজ আদায় এবং তাদের দুর্নীতিমুক্ত রাখার।
আমাদের অর্থনীতি মূলত পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি খাতে এবং এখানেই সিংহভাগ শ্রমশক্তি নিয়োজিত। তাদের সিংহভাগ আবার নিয়োজিত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এ পর্যন্ত ১৪২ খাত-উপখাত চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলোর ১০০টি ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর বাইরে। যেসব খাতে ন্যূনতম মজুরি ঘোষিত, সেগুলোতেও বাস্তবায়ন পরিস্থিতি উৎসাহব্যঞ্জক নয়। এর বাইরে মজুরি নির্ধারিত হচ্ছে স্রেফ চাহিদা ও জোগানের ঘাত-প্রতিঘাতে। ন্যূনতম মজুরিও সময়মতো হালনাগাদ হচ্ছে কমই। এসব বিষয় সামনে এসেছিল অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম কমিশন গঠনের পর। তারা যেসব সুপারিশ করেছিল, সেগুলোর সিংহভাগই আবার অবাস্তবায়িত।
প্রথমে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন, বিশেষত গত দুই বছরে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ হারানোর ঘটনা বাড়ার সময় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলো মোকাবিলা করেছে কী পরিস্থিতি; কত কাজ সেখানে সৃষ্টি হয়েছে আর কত কাজ হারানোর ঘটনা ঘটেছে; এর মধ্যে নতুন কোনো খাত গড়ে উঠেছে কিনা; কোন খাতে কী ধরনের সহায়তা খুবই প্রয়োজন।

নির্বাচনের আগে বিএনপি বলেছিল ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা। এক মেয়াদে এক কোটি লোককে বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও ছিল। ছয় মাস ইতোমধ্যে অতিবাহিত। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে কাজের সুযোগ তৈরির চেয়ে কাজ হারানোর ঘটনাই বেশি ঘটেছে বলে মনে হয়। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সেটাই বলছে।
সরকার অবশ্য চেষ্টা করছে বিশেষ তহবিল ও ঋণ সহায়তা জুগিয়ে বন্ধ কলকারখানা চালু করতে। প্রধান উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান। সরকারি খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এগুলো সময়সাপেক্ষ। শর্তসাপেক্ষও বটে। এই মুহূর্তে বেশি প্রয়োজন চালু কলকারখানা ধরে রাখা, মানুষ যাতে কাজ না হারায়। অবস্থা এমন যে, তাদের মজুরি বৃদ্ধির জরুরি প্রশ্নটি যেন পরে নিষ্পত্তি করলেও চলবে!
মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হারে মজুরি বাড়ছে– এটা অবশ্য নির্মম সত্য। সে কারণে বেসরকারি খাতে কর্মরত কোটি কোটি মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। কমছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান। এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে পুষ্টি পরিস্থিতি ও মানবসম্পদ তৈরিতে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করে সরকার অবশ্য চেষ্টা করছে অভিজ্ঞতাকে বিপরীতমুখী করতে। সে ক্ষেত্রেও আছে তার সামর্থ্যের ঘাটতি। সরকার বেশি রাজস্ব আহরণ করতে পারছে না বলে শুধু যে তার কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে সংকটে ছিল, তা নয়। সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকার বাধার সম্মুখীন।
হালে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়ানোর কারণেও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয় কিনা, সেই শঙ্কার কথা বলছেন অনেকে। বেতন-ভাতার মতো অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়াতে গিয়ে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় তথা এডিপি বাস্তবায়ন আরও কমে যায় কিনা– সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। এটা কমে গেলেও কর্মনিয়োজন কমবে; গতি কমবে অবকাঠামো উন্নয়নে এবং প্রবৃদ্ধিতে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব।
সরকার তার কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোয় কারও আপত্তি থাকবে না– যদি বাজারে এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে থাকে; এ কারণে জনকল্যাণমূলক ব্যয় না কমে; মানুষ যদি দেখতে পায়, বেসরকারি খাত তার সংকট কাটিয়ে উঠছে এবং সেখানে কর্মনিয়োজন বাড়ছে শুধু নয়; মজুরিও বাড়ছে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে। সরকারি খাতে বিপুল অপচয় রোধ এবং অপ্রয়োজনীয় জনবল কমিয়ে আনাও জরুরি। তাতে অন্য দিক দিয়ে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রিত হতে দেখলেও মানুষ নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নকে সহজভাবে নেবে।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
- পে স্কেল