মহাসড়কে এআই নজরদারি
সতর্কতার সহিত স্বাগত
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআইনির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালুর প্রথম ১০ দিবসে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মামলা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাসের ঘটনা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে এই তথ্য উঠিয়া আসিয়াছে, সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকায় গাড়িচালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মান্য করিবার প্রবণতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। সোমবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা রোধে হাইওয়ে পুলিশের নজরদারির সক্ষমতা বৃদ্ধি করিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাটি উদ্বোধন করিবার দিবসেই স্বয়ংক্রিয় মামলা হয় ৪৪৬টি। ১০ম দিবসে উহা ৩৪-এ নামিয়া আসিয়াছে। অর্থাৎ ১০ দিনের ব্যবধানে ৯২ শতাংশের অধিক মামলা হ্রাস পাইয়াছে। উপরন্তু ট্রাফিক আইন অমান্য করা গাড়ির বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ, তৎসহিত মহাসড়কে ডাকাতি, ছিনতাইসহ কোনো অপরাধ সংঘটিত হইলে তাহাও ক্যামেরাবন্দি হইতেছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, মহাসড়কে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাইবার সুযোগ রহিয়াছে। কিন্তু আইন প্রয়োগের ঘাটতি, আইন সম্পর্কে চালকদের অসচেতনতা, তৎসহিত অন্যান্য কারণে সড়ক-মহাসড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালনা বহুদিন যাবৎ কার্যত মহোৎসবে রূপ লইয়াছে। যাহার কারণে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটিয়াই চলিয়াছে। সময় সাশ্রয়ের নামে উল্টা পথে গাড়ি চালাইবার অভ্যাসও হালকা-ভারী সকল প্রকার যানবাহনের চালকদের বাতিকে পরিণত হইয়াছে। হাইওয়ে পুলিশের ভাষ্য, জনবল সংকটে মহাসড়কের প্রতি অংশে সার্বক্ষণিক নজরদারি সম্ভব হয় না। তাই চালকদের মধ্যে আইন ভঙ্গ করিবার প্রবণতা প্রবল। শুধু উহাই নহে, অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিতে গেলে গাড়ির প্রভাবশালী মালিকগণ বিবিধ প্রকারে হস্তক্ষেপে সচেষ্ট থাকিতেন। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অপরাধ শনাক্তের পর মামলা হওয়ায় সেই প্রভাব প্রদর্শনের অবকাশ আর নাই।
জানা গিয়াছে, বর্তমান পদ্ধতিতে যানবাহনের নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল ফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমে মামলার তথ্য প্রেরণ করা হইতেছে। জরিমানার টাকা পরিশোধ ব্যতীত বিকল্প পথ খোলা থাকিতেছে না। এমতাবস্থায় প্রতিবেদনমতে, বিভিন্ন পরিবহন মালিক তাহাদের চালকদের উদ্দেশে নির্দেশনা জারি করিয়াছেন– ট্রাফিক আইন মান্য করিয়াই গাড়ি চালাইতে হইবে। অন্যথায় ভিডিও মামলা হইলে জরিমানা চালককেই বহন করিতে হইবে। স্বাভাবিকভাবেই এআই ক্যামেরার নজরদারির কারণে সড়কে চালকদের মধ্যে আইন মান্যকরণের অভ্যাস তৈরি হইতেছে, যাহা মালিক-চালক-যাত্রী সকলের জন্যই হিতকর। বিশেষত দেশে নিরাপদ সড়কের জন্য দীর্ঘদিন যাবৎ যেই আন্দোলন চলিতেছিল, সেই ক্ষেত্রেও অগ্রগতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হইয়াছে।
তবে আলোচ্য ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহাসড়কে যানজট ও অন্যান্য সমস্যা সমাধান করিবে– এই বিশ্বাস পোষণের কোনো অবকাশ নাই। উদ্যোগটিকে স্বাগত জানাইয়া প্রতিবেদনে কয়েকজন বাসচালক যথার্থই বলিয়াছেন, শুধু ক্যামেরা স্থাপন করিয়া শতভাগ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সম্ভব হইবে না। দুর্ঘটনা পরিহারে ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ ধীরগতির যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সহিত ফিডার রোড হইতে মহাসড়কে উঠিবার সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার গাড়িচালকদের সতর্ক করাও জরুরি। সর্বোপরি, সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন, মহাসড়কে হাটবাজার স্থাপন বন্ধ এবং পথচারী চলাচল নিয়ন্ত্রণ করিতে হইবে। এই সকল ক্ষেত্রে ব্যর্থ হইলে এআই নজরদারির উদ্যোগও কার্যত বিফলে যাইবে।
সকল দিক বিবেচনায়, আলোচ্য সাফল্যকে আমরা সতর্কতার সহিত স্বাগত জানাই। স্মরণে রাখিতে হইবে, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট এবং তৎসৃষ্ট যাত্রী-দুর্ভোগ এখনও সংবাদের শিরোনামে উঠিয়া আসে, যাহার পশ্চাতে যানবাহন চালকদের বেপরোয়া ভাব অপেক্ষা উপরে বর্ণিত সমস্যাগুলির ভূমিকাই অধিক।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়