শিক্ষা
পরীক্ষার ফলই জীবন নয়
গওহার নঈম ওয়ারা
গওহার নঈম ওয়ারা
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল দেখল দেশ। এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ফেল করেছে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী। পরিসংখ্যান বলছে, এসএসসিতে পাসের এ হার ২০০৭ সালের পর সবচেয়ে কম। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর ১৯ বছরে আর কখনও পাসের হার এত নিচে নামেনি।
কেন এ বিপর্যয়, তা নিয়ে অনেক রকম বিশ্লেষণ আছে। কিন্তু একটি কথা মনে রাখতে হবে, ফল বিপর্যয়ের পর অনেক শিক্ষার্থী ঝোঁকের মাথায় ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। সেই পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি হয় সারাবছর ধরে। গত ১০ আগস্ট এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েকটি আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যেই খবর এলো, শরীয়তপুরে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। কয়েক বছর আগেও এই জনপদে বাল্যবিবাহ সহজ ছিল না। থানা পুলিশ হতো এবং শিক্ষার্থীরাই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে ছুটে যেতেন সরকারি দপ্তরে। আসামিদের ‘দৌড়ানির’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ত সামাজিক মাধ্যমে। অন্যরা সাবধান হতেন অথবা তারিখ পেছাতেন। এখন মনে হচ্ছে, সবাই বিষয়টি ক্রমেই মেনে নিচ্ছেন। এসব নিয়ে যখন শরীয়তপুরে ‘আবার জাগতে হবে’ মার্কা ভাষণ চলছিল, তখন রাজশাহীর বাগমারা থেকে তহিদুল ফোন করে জানিয়েছিলেন কারিনার কথা। এসএসসিতে রসায়ন আর পদার্থবিজ্ঞানে অকৃতকার্য হয়ে কারিনা আত্মহত্যা করেছে। ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের দিনেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের হালিমা খাতুন তরিকা ইংরেজিতে খারাপ করায় বিষপান করে মারা গেছে।
শিক্ষার্থীদের এই আত্মহত্যার ট্র্যাজেডির দায় কি সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা এড়াতে পারে? পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সাফল্য পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে হই-হুল্লোড় করা হয়। কিন্তু খারাপ ফল করা ছাত্রছাত্রীরা কেন ফেল করল, তা নিয়ে কি কোনো গবেষণা হয়? এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এবার অংশ নেয় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ১১টি বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পাস করাদের মধ্যে ছাত্র পাঁচ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন এবং ছাত্রী ছয় লাখ সাত হাজার ৯৩৯ জন। ছাত্রীদের গড় পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং ছাত্রদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
এবার ফেল করেছে ছয় লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। ১১টি বোর্ডের ফলে সবার ওপরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং তলানিতে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। কারিকুলামে যেভাবে শেখানোর কথা, সেভাবে শেখালে কেউ ফেল করার কথা নয়। কারিকুলাম নামমাত্র মানে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তারা মানসম্মত উপায়ে ক্লাসে পড়াতে পারেন না এবং শিক্ষকরা বেতন-ভাতা কম পাওয়ায় নিজ পেশায় মনোযোগ কম দেন। এতে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পড়াতেও তারা অবহেলা করেন– এসব কথা বলেছেন শিক্ষা বোর্ডের মোর্চা বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
দেশের সামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের জীবনে অভিভাবকের প্রত্যাশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘আমি যদি ফেল করি, মা-বাবাকে কী করে মুখ দেখাব’– এই প্রশ্ন অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। একসময় ইরানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ভাবিয়ে তুলেছিল। ইরানে এখন প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলাদা একটি বিভাগ থাকে। যে বিভাগ শিক্ষার্থীর ফল খারাপ হলে তাদের কাউন্সেলিং করে। প্রতি টার্মে এমন শিক্ষার্থীদের বাছাই করে তাদের দেখা করতে বলা হয়। সেখানে শিক্ষার্থী তার ফল খারাপের কারণ নিয়ে কথা বলে এবং পরামর্শ নেয়। শিক্ষার্থীর সারাদিনের কাজের তালিকা, পাঠের সময় এবং কোনো মানসিক সমস্যা থাকলে তা নিয়েও আলোচনা করেন শিক্ষকরা। আমরা হয়তো ঠিক এই ধারা অনুসরণ করতে পারব না; কিন্তু আমাদের ফল খারাপ করা শিক্ষার্থীদের জন্য আরও একটু সংবেদনশীল হতে পারি।
এসএসসি পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফলকে জীবনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হিসেবে না দেখা এবং পরীক্ষার ফল খারাপ হলে দ্রুত মানসিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা। শিক্ষার্থীকে তাঁর পরিবার ও শিক্ষকরা বোঝাবেন– ফেল বা কম নম্বর জীবনের শেষ নয়; সামনে আবার পরীক্ষা দেওয়া ও বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে। অন্যের ফলের সঙ্গে সন্তানের ফল তুলনা করবেন না। খারাপ ফল হলে প্রথমেই বলুন– ‘আমরা তোমার পাশে আছি।’ সন্তানকে একা রাখবেন না। ফল প্রকাশের দিন ও পরবর্তী কয়েক দিন সন্তানের মানসিক অবস্থার দিকে বিশেষ নজর দিন। সন্তানের ঝুঁকির লক্ষণ খেয়াল করুন– নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া; ‘আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই’ বলা; বিদায় নেওয়ার মতো আচরণ বা আত্মক্ষতির প্রস্তুতি তার আছে কিনা, সেদিকে সতর্ক থাকুন। শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে অপমান না করে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলবেন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমের চাপ কমাতে হবে। অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের ফল তুলনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক, গবেষক
- বিষয় :
- গওহর খান
- পরীক্ষা
- পরীক্ষার ফল