ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমাজ

শিশুর স্ক্রিন অনুরাগের অতি সরলীকরণ

শিশুর স্ক্রিন অনুরাগের  অতি সরলীকরণ
×

জান্নাতুল রুহী

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার শিশুরা নাকি দিনে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় কাটায়। এতে তাদের পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে না; পাশাপাশি স্থূলতা ও বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে (সমকাল, ১৫ মে ২০২৬)।

দুই.
ছেলের জোরাজুরিতে আবার তাকে নিয়ে যেতে হয়েছিল রাজধানীর একটি অত্যাধুনিক ইনডোর অ্যামিউজমেন্ট পার্কে। সেখানে বসে শিশুদের আনন্দ দেখতে দেখতে মনে হলো, খেলার জায়গাটা কিন্তু আমাদের শৈশবের মতো নয়। খোলা মাঠ নয়; খেলা হচ্ছে শপিংমলের ভেতরে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে, নানা ধরনের রাইড, গেম ও প্রযুক্তির সঙ্গে।
বাংলাদেশে এ ধরনের পার্কের উত্থান ২০১৭ সালের দিকে। উদ্দেশ্য, ঢাকায় শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খোলা মাঠ ও পার্কের সংকট; বাবা-মা যেন তাদের সন্তানদের নিয়ে কেনাকাটার পাশাপাশি একই ছাদের নিচে আনন্দময় সময় কাটাতে পারেন।

শুধু বিনোদন কেন্দ্র তৈরির গল্প নয়; এর মধ্যে আছে শিশুর বদলে যাওয়া শৈশবের স্পষ্ট চিত্র। খেলার মাঠ কমেছে; প্রাকৃতিক পরিবেশে তৈরি করা পার্কের সংখ্যাও কমছে। কিন্তু খেলার প্রয়োজন কমেনি। এ জন্য বিকল্প খেলার জায়গা তৈরি করা হয়েছে। সঙ্গে কি খেলার ধরনও বদলায়নি? শুরুতে ছিল শিশুদের উপযোগী রাইড, সফট প্লে জোন, বোলিংসহ নানা বিনোদন। সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন; ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, সিমুলেটর, রেসিং প্রভৃতি। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে শিশুর বিনোদনের নিয়ন্ত্রিত পরিসরও প্রযুক্তিঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তাহলে আসল পরিবর্তনটা কোথায়? শিশুদের খেলার ইচ্ছায়, নাকি তাদের শৈশবের পরিবেশে?

তিন.
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা-ড্যাপের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ নেই। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, দুই সিটি করপোরেশনের ৯৩টি ওয়ার্ডে মোট ২৩৫টি খেলার মাঠ আছে, যার বড় অংশই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধীনে। সবার জন্য উন্মুক্ত মাঠের সংখ্যা মাত্র ৪২। প্রশ্ন হলো, শুধু খেলার মাঠ হলেই কি সেখানে শিশুরা যায়? অভিভাবকরা তাদের নিয়ে যান? 
২০২১ সালে ঢাকা নিয়ে স্থপতি ও গবেষক রাশেদ ভূঁইয়ার এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়ি থেকে খেলার মাঠের দূরত্ব যত বৃদ্ধি পায়, সেখানে শিশুদের যাতায়াতের হার তত কমে যায়। অর্থাৎ শিশুর জন্য মাঠ থাকার পাশাপাশি সেখানে সহজে পৌঁছানোর বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। 
কিছুদিন আগে আমার ছেলের সহপাঠীদের মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। একজন বললেন, ‘ছেলে কিছুতেই মাঠে খেলতে যেতে চায় না। জোরাজুরি করি, কিন্তু কোনো লাভ হয় না।’ আরেকজন বললেন, ‘আমি আর ওর বাবা দুজনেই অফিসে চলে যাই। মাঠে যাব কীভাবে? কখন যাব?’ আরেকজন বললেন, ‘একা ছাড়তেও ভয় হয়! কার সঙ্গে মিশবে, নিরাপদ কিনা– এগুলোও তো বুঝি না!’ কেউই উল্লেখ করেননি, ‘কাছে মাঠ নেই’। 
আসলে অভিভাবকের সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতা এবং এই দুইয়ের মাঝে সন্তানকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দেওয়ার তাগিদ– তিনটা অঙ্ক মেলাতে গিয়ে প্রতিদিন মা-বাবাকে হিমশিম খেতে হয়। এটা কোনোভাবেই শুধু মাঠের সংখ্যা হ্রাসের সংকটের মতো সরল বিষয় নয়।

চার.
শিশুদের স্ক্রিনের ওপর নির্ভরতা নিয়ে আলোচনায় প্রায় সময়ই বিশেষজ্ঞরা খেলার মাঠের সংকট, শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ হ্রাস এবং শিশুর ঘরমুখী হয়ে পড়ার দিকে আঙুল তুলেছেন। কিন্তু এটা সমস্যার সরলীকরণ মাত্র। সত্য যে, মাঠের সংকট শিশুদের বাইরে খেলাধুলার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এটা শিশুর স্ক্রিন-নির্ভরতার একমাত্র কারণ? 
কভিড-১৯ অতিমারিকালে দীর্ঘসময় স্কুল, মাঠ, খেলার স্থান, পার্ক প্রভৃতি বন্ধ ছিল। সেই সময়ে লকডাউনের কারণে প্রজন্ম আলফার সামাজিকতা, খেলাধুলা ও অবসরযাপন ছিল ঘরকেন্দ্রিক। ডিজিটাল ডিভাইসই হয়ে উঠেছিল তাদের ক্লাসরুম, বিনোদনের উৎস এবং বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। অনেক শিশুর কাছেই স্ক্রিন-নির্ভরতা তখন থেকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। 
আলফা প্রজন্মের শিশুরা ইউটিউব শর্টস, টিকটক ও রিলসেও অভ্যস্ত। প্রতি আট থেকে ১৫ সেকেন্ড পর নতুন দৃশ্য, নতুন হাস্যরস আসতেই থাকে। এসব প্ল্যাটফর্ম তাদের মনোযোগ ও বিনোদন চর্চাকে পরিবর্তন করছে; তাৎক্ষণিক স্বস্তির অভ্যাসও তৈরি করছে। একই সঙ্গে শহুরে যানজট, বায়ুদূষণ, নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকেও ঢাকার মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো শিশুর বিনোদনের জন্য ইনডোর এন্টারটেইনমেন্ট পার্কে যান।

পাঁচ.
বৈশ্বিক মিডিয়াগুলো শুধু সংবাদ প্রকাশই নয়, এই সংকটের সমাধানও অনুসন্ধান করছে। বিবিসি তাদের ‘সলভ দ্য স্টোরি’ সিরিজের মাধ্যমে শিশুদের শেখাচ্ছে সংবাদ কীভাবে যাচাই করতে হয়; সত্য-অসত্য-বিভ্রান্তি কীভাবে বুঝতে হয়। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান স্কুলে মিডিয়া লিটারেসি অ্যাম্বাসাডর তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স প্রতিবছর সাংবাদিক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিয়ে মিডিয়া লিটারেসি উইক-এর আয়োজন করছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোয় আজকের শিশুদের শৈশবের পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তিত হয়েছে অভিভাবকের বাস্তবতাও। শিশুদের নিয়ে সত্যিকার অর্থে ভাবতে হলে বর্তমান সময় ও সমাজের জটিলতা আগে স্বীকার করতে হবে। সমস্যার গভীরতা অস্বীকার করে সহজ উত্তর অনুসন্ধান করাই যায়। কিন্তু সেটা কার্যকর সমাধান দিতে অপারগ।

সাংবাদিক ও লেখক

আরও পড়ুন

×