গ্যাস সংকটে অর্ধেকে উৎপাদন, বন্ধ হয়ে গেছে দুই কারখানা
উপজেলার হবির বাড়ি ইউনিয়নের পাড়াগাঁও এলাকার এক্সিলেন্ট টাইলস এন্ড সিরামিকস কারখানা। ছবি: সমকাল
ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৪২
ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছে শিল্পকারখানাগুলো। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও ২০ আগস্ট থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন গড়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ইতোমধ্যে দুটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আরও পাঁচটি কারখানার গ্যাসনির্ভর ইউনিট বন্ধ রয়েছে। অন্তত ২০টি কারখানায় শ্রমিকদের ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া হয়েছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) এবং ময়মনসিংহ শিল্প পুলিশ-৫ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে গ্যাসনির্ভর আরও বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
উপজেলার কাঠালী এলাকার উছমান গ্রুপের রাসেল স্পিনিং মিল ও পাড়াগাঁও এলাকার এক্সিলেন্ট টাইলস ইতোমধ্যে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার পর্যায়ক্রমে কারখানা দুটির শ্রমিকদের রোববার পর্যন্ত ছুটি দেওয়া হয়। সোমবার থেকে উৎপাদন শুরুর কথা থাকলেও গ্যাস সংকট আরও প্রকট হওয়ায় সংকট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কারখানা দুটি বন্ধ রাখার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠান দুটির প্রায় ১ হাজার ৪৪ শ্রমিক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এ ছাড়া এক্সিলেন্ট সিরামিক, সৌদি বাংলা ফিডস, আকবর কটন, ডেনিস মাল্টিপারপাস ও তাল্লু স্পিনিং মিলের গ্যাসনির্ভর ইউনিটগুলো বন্ধ রয়েছে।
ডিআইএফই ও শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ভালুকা শিল্পাঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯টি কারখানা গ্যাসনির্ভর। গ্যাসের চাপ কমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং ও সিরামিক শিল্প।
বর্তমানে উপজেলার গৌরীপুরের টয়োটা স্পিনিং মিলে ৫০টি মেশিনের মধ্যে ৪৩টি বন্ধ রয়েছে। সীমা স্পিনিং মিলেও ৩০টি মেশিন বন্ধ থাকায় উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। বাশার স্পিনিং, নরটেক্স টেক্সটাইল ও ডেল্টা স্পিনার্সেও উৎপাদন ৫০ শতাংশ বা তার বেশি কমেছে। এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলে প্রায় ৪০ শতাংশ মেশিন বন্ধ রয়েছে। আর এক্সিলেন্ট সিরামিকের ফার্নেস বন্ধ থাকায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে।
সরেজমিনে কয়েকটি কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় জেনারেটর ও বয়লার ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কারখানাগুলোর দৈনিক আর্থিক ক্ষতিও বাড়ছে।
ভরাডোবা এলাকার গোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলসের ইউটিলিটি বিভাগের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমেদ বলেন, ‘দেড় থেকে দুই মাস ধরে আমাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ কম। জেনারেটর ও বয়লার চালু রাখতে যেখানে কমপক্ষে ১৬ পিএসআই চাপ প্রয়োজন, সেখানে সর্বোচ্চ ১১ থেকে ১২ পিএসআই পাওয়া যাচ্ছে। এতে উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে।’
এক্সিলেন্ট টাইলস কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, গ্যাস সংকটে উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমেছে। এতে প্রতিদিন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের সিস্টেম অপারেশন ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী শামীম হোসেন বলেন, ভালুকায় ১৪০ ও ৫০ পিএসআই সক্ষমতার দুটি লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। সংকটের সময় সরবরাহ ৩০ থেকে ৫০ পিএসআইয়ে নেমে আসে। পরে কখনও চাপ ৬০ থেকে ৯০ পিএসআই পর্যন্ত উঠলেও শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য তা পর্যাপ্ত নয়।
তিনি বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় স্থানীয়ভাবে এ সংকট তৈরি হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে সংকট কবে নাগাদ সমাধান হবে, সে বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা নেই।
ডিআইএফই, ময়মনসিংহের উপমহাপরিদর্শক আহাম্মদ মাসুদ বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলোয় উৎপাদন অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে শ্রমিকদের ছুটি, কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া এবং সম্ভাব্য কারখানা বন্ধের কারণে শ্রমিকদের মজুরি ও শ্রম অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।
ময়মনসিংহ শিল্প পুলিশ-৫-এর পুলিশ সুপার মো. আনছার উদ্দিন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ভালুকার শিল্প খাতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় এরই মধ্যে দুটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ এবং পাঁচটি কারখানার গ্যাসনির্ভর ইউনিট বন্ধ রয়েছে। আরও অন্তত ২০টি কারখানার শ্রমিকদের ধাপে ধাপে ছুটি দিতে হয়েছে। পরিস্থিতি শিল্প পুলিশ পর্যবেক্ষণ করছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের চাপ সামান্য ওঠানামা করলেও ভালুকা শিল্পাঞ্চলে এখনো স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন আরও কমে যাওয়া, নতুন কারখানা বন্ধ হওয়া এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
- বিষয় :
- ময়মনসিংহ
- গ্যাস সংকট