ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে তুরস্কের ব্যাংকসহ ৩ প্রতিষ্ঠানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে তুরস্কের ব্যাংকসহ ৩ প্রতিষ্ঠানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
×

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। ছবি: গেটি ইমেজেস

রয়টার্স 

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:২৪

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে তুরস্কের একটি বিনিয়োগ ব্যাংক ও এর দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয়।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে ইস্তাম্বুলভিত্তিক গোল্ডেন গ্লোবাল ইয়াতিরিম ব্যাংকাসি আনোনিম সিরকেতি, গোল্ডেন গ্লোবাল পোর্টফোলিও ইয়োনেতিমি আনোনিম সিরকেতি এবং গোল্ডেন গ্লোবাল ভার্লিক কিরালামা আনোনিম সিরকেতি।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, চীন ও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কুদস ফোর্সের মধ্যে বাণিজ্য সহজতর করতে এসব প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রেখেছে। ইরানের তেল বিক্রির অর্থ চীন থেকে তুরস্কে স্থানান্তর এবং পরে তা নগদ ও স্বর্ণে রূপান্তরের সুযোগ করে দিতে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করেছে বলেও অভিযোগ করেছে ট্রেজারি বিভাগ।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ‘অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’ (ওএফএসি) তিন প্রতিষ্ঠানকে ‘স্পেশালি ডেজিগনেটেড ন্যাশনালস’ (এসডিএন) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে তারা মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে লেনদেন গুটিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে ট্রেজারি বিভাগ একটি সাধারণ লাইসেন্সও জারি করেছে।

ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরান ও দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে বাণিজ্যে সহায়তা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই পদক্ষেপ একটি স্পষ্ট বার্তা। তিনি জানান, ইরানের আর্থিক যোগাযোগের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বেসেন্ট দাবি করেন, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরানের অপরিশোধিত তেলের চালান চীনে পৌঁছাতে পারছে না। এতে বেইজিংয়ের ওপর চাপ বাড়ছে এবং যুদ্ধ চালানোর জন্য তেহরানের প্রয়োজনীয় আয় কমছে।

তিনি আরও বলেন, প্রণালীর ভেতরে আটকা থাকা জাহাজগুলোতে অপরিশোধিত তেল জমে থাকায় নতুন করে মজুদ গড়ে তোলা যাচ্ছে না। ইরানের রপ্তানি ব্যবস্থার ‘জীবনরেখা’ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বেসেন্ট ‘আমেরিকাস ভয়েস নিউজ’-কে জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে আরও একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।

তুরস্কের ৩৫তম বৃহত্তম ব্যাংক গোল্ডেন গ্লোবাল ইয়াতিরিম ব্যাংকাসি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ব্যাংকটি জানিয়েছে, তারা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং এবং কমপ্লায়েন্সের সব শর্ত মেনে চলেছে। ভিত্তিহীন অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিবে।

ব্যাংকটির দাবি, ওএফএসি নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহক ছিল না এবং তাদের সঙ্গে ব্যাংকটির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো লেনদেনও ছিল না। ‘দ্যব্যাংকস ডট ইইউ’ ডেটাবেস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গোল্ডেন গ্লোবাল ইয়াতিরিম ব্যাংকাসির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন তুর্কি লিরা বা ৫১৬ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

‘ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’-এর নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মিয়াদ মালেকি বলেন, তুর্কি ব্যাংকটি আকারে ছোট হলেও বর্তমান অভিযানের আওতায় কোনো ন্যাটো সদস্য দেশের ব্যাংক হিসেবে এটিই প্রথম নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরীয় পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অর্থ স্থানান্তরের পরবর্তী স্বাভাবিক গন্তব্য হতে পারে তুরস্ক। এ কারণে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সেখানে নজর রাখছে।

মালেকি আরও বলেন, যেসব বিদেশি ব্যাংক গোল্ডেন গ্লোবালের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তারাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো পরোক্ষ প্রভাব তৈরি করা, প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ওই ব্যাংকটি একা বড় বিষয় নয়।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, ইরানের ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীন থেকে তুরস্কে তেল বিক্রির অর্থ স্থানান্তরে গোল্ডেন গ্লোবালকে ব্যবহার করা হয়েছিল। তুরস্কে পৌঁছানোর পর মানি এক্সচেঞ্জারদের মাধ্যমে ওই অর্থ নগদ ও স্বর্ণে রূপান্তর করা সম্ভব হতো বলেও অভিযোগ করেছে তারা।

ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, গোল্ডেন গ্লোবাল জেনেশুনে ইরানি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। এর ফলে কুদস ফোর্স ও তাদের সহযোগী বিভিন্ন পক্ষ নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ পায়। এসব সহযোগীর মধ্যে ২০২২ সালে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা তুর্কি ব্যবসায়ী সিটকি আয়ান ও তাঁর কোম্পানিগুলোও রয়েছে।

বেসেন্ট, যিনি গত মাসে বিশ্বজুড়ে ইরানের আর্থিক যোগাযোগের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক আক্রমণ’ চালানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, বলেছেন ওয়াশিংটন তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে চাপ সৃষ্টি করছে।

গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মিসরীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক মিসর’-এর শাখাগুলোর ওপর ‘প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট’-এর আওতায় বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেয়। ইরানের সঙ্গে লেনদেনের কারণে ব্যাংকটির মার্কিন ডলার লেনদেনে এই কড়াকড়ি আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এতে ব্যাংক মিসরের প্রধান কার্যালয় বা অন্য দেশের শাখাগুলো প্রভাবিত হবে না এবং পদক্ষেপটি কার্যকর হতে ৩০ দিন সময় লাগবে।

নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ‘অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজারস’-এর ম্যানেজিং প্রিন্সিপাল ব্রেট এরিকসন এই পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এর ফলে তেহরানের পক্ষ থেকে পাল্টা ব্যবস্থা বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ আসতে পারে।

এরিকসন বলেন, গোল্ডেন গ্লোবালের ওপর নিষেধাজ্ঞা ইরানের ওপর চাপ সামান্য বাড়াবে। তবে ইরানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং যুদ্ধের ফলাফল বদলে দেওয়া—দুটি ভিন্ন বিষয়।

তিনি আরও বলেন, এই চাপ যদি যুদ্ধের অর্থনৈতিক গতিপথ অর্থবহভাবে পরিবর্তন করতে না পারে, তাহলে ওয়াশিংটন ইরানকে এমন পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্ররোচিত করতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

আরও পড়ুন

×