ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

আমিই ব্রাজিলের প্রকৃত নেতা: ফ্লাভিও

আমিই ব্রাজিলের প্রকৃত নেতা: ফ্লাভিও
×
×

যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উড়োজাহাজ থেকে নামছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। ছবি: রয়টার্স

দ্য গার্ডিয়ান

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৫০

রোববারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিজেকে ব্রাজিলের ‘প্রকৃত প্রেসিডেন্ট’ বলে ঘোষণা করেছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো। বুধবার সকালে সপরিবারে ফ্লোরিডার মায়ামিতে পৌঁছে একটি চিঠির মাধ্যমে এ দাবি জানান কট্টর ডানপন্থী এই সিনেটর। পরে অবশ্য চিঠি থেকে ‘প্রকৃত প্রেসিডেন্ট’ শব্দবন্ধ সরিয়ে নিজেকে ‘ব্রাজিলের নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। 

অথচ ফ্লাভিওর নিজের দল, ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এবং আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বৈধ বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ব্রাজিলের তিনটি প্রধান সংবাদপত্র—ফোলহা দে এস. পাওলো, ও গ্লোবো এবং ও এস্তাদো দে এস. পাওলো—ফ্লাভিওর প্রথম ঘোষণাকে ‘অভ্যুত্থানে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

রান-অফ ভোটে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর ফ্লাভিও ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন। আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানায়, মঙ্গলবার রাতে স্থলপথে দেশটিতে প্রবেশ করেন তিনি। সেখান থেকে ইকুয়েডর হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান স্ত্রী ও দুই কিশোরী মেয়েকে নিয়ে।

ফ্লাভিও ‘গালফস্ট্রিম ৪’ মডেলের একটি ব্যক্তিগত বিমানে ওঠেন। বিমানটি সোমবার ভোর থেকেই আর্জেন্টিনার পুয়ের্তো ইগুয়াজু বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে, এই বিমানে করেই দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে ফ্লাভিও ও তার পরিবারকে নিয়ে বিমানটি ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলের উদ্দেশে রওনা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ব্রাজিলের আকাশসীমা এড়িয়ে যেতেই এ পথ বেছে নেন তিনি। ইকুয়েডরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির পর তারা মায়ামির ওপা-লকা বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরটি মায়ামি শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১১ মাইল উত্তরে অবস্থিত। এটি মূলত করপোরেট নির্বাহী ও ধনী ভ্রমণকারীদের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয়।

সকাল ৯টা ২৪ মিনিটে ফ্লাভিও ও তার পরিবারের সদস্যরা বিমান থেকে নামেন। তখন দক্ষিণ ফ্লোরিডায় ছিল ঝলমলে সকাল। বিমান থেকে নামার সময় কালো রঙের বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরা ফ্লাভিওকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছিল। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার আগে তারা কিছুক্ষণ ভেতরে অবস্থান করেন। পরে কালো ছাতার আড়ালে বেরিয়ে একটি গাঢ় ধূসর রঙের ফোর্ড এক্সপেডিশন ম্যাক্স গাড়িতে ওঠেন। এরপর পুলিশের পাহারায় দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন তাঁরা।

গাড়িতে ওঠার আগে ফ্লাভিও সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। পুরো পরিবেশ ছিল শান্ত। তাঁকে স্বাগত জানাতে কোনো সমর্থকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। শুধু প্রায় দুই ডজন সাংবাদিক ছিলেন। তাঁদের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি)-এর দুই এজেন্ট নির্দিষ্ট দূরত্বে আটকে রাখেন।

মায়ামিতে পৌঁছানোর প্রায় সাত ঘণ্টা পর প্রকাশিত চিঠিতে ফ্লাভিও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে তাঁর ‘সাহস, ন্যায়বোধ ও আইনানুগ দৃষ্টিভঙ্গির’ জন্য ধন্যবাদ জানান। এ ছাড়া তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ‘আমেরিকার চমৎকার মানুষদের’ প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

চিঠিতে কোনো প্রমাণ ছাড়াই আবারও নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন ফ্লাভিও। ব্রাজিলের নির্বাচনী আদালত, সুপ্রিম কোর্ট এবং দেশটির নিম্নকক্ষ ও সিনেটের সভাপতিরা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। সোমবার ফ্লাভিওর দল জানিয়েছিল, তারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিচ্ছে।

ফ্লাভিও ও তার সহযোগীরা চিঠিটির অন্তত তিনটি ভিন্ন সংস্করণ প্রকাশ করেন। এর একটি সংস্করণে দেশটির ১৯৬৮ সালের আগের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্যদিকে, পর্তুগিজ বানান ‘Brasil’-এর পরিবর্তে ইংরেজি বানান ‘ ব্রাজিল’ লেখা হয়। অনেকে এটিকে বলসোনারো পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের আরেকটি নিদর্শন হিসেবে দেখছেন।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ফ্লাভিও ও তার পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে মানবিক ভিসা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার বিষয়টি তিনি অনুমোদন করবেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘তারা ভালো মানুষ। আমি কোনো পক্ষ নিইনি, বুঝতেই পারছেন। আমি তাদের দুজনকেই চিনি। লুলাকে চিনি। ফ্লাভিওকেও কিছুটা চিনি। আর তার বাবাকে তো খুব ভালোভাবেই চিনি।’

তবে বুধবার ফ্লাভিওর দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ব্রাজিলের নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা থেকে নিজেকে দূরে রাখার কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘দেখুন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। তবে আমি জানি, তাকে (ফ্লাভিওকে) আমাদের দেশে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দেখা যাক কী হয়। তবে আমি এতে জড়াব না। নির্বাচনটা যে খুবই অদ্ভুত ছিল, তা নিশ্চিত।’

ফ্লাভিওর দেশত্যাগকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন লুলা। ব্রাসিলিয়ায় নিজের ৮১তম জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বলসোনারো পরিবার এমনই। ব্রাজিল তাদের কাছে দ্বিতীয় মাতৃভূমি।’ তাঁর ভাষ্য, পরিবারের প্রথম মাতৃভূমি এখন যুক্তরাষ্ট্রের পদলেহন করছে, যেমনটা করতে তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

ব্রাজিল সরকারের কেউ কেউ সন্দেহ করছেন, ফ্লাভিওর সহযোগীরা মঙ্গলবার গোপনে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পথে রয়েছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল আর্জেন্টিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রকৃত পরিকল্পনা থেকে সবার মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া। ফ্লাভিওকে দেশত্যাগ করা থেকে আটকাতে ব্যর্থ হওয়ায় ফেডারেল পুলিশও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে সহযোগীদের সামনে ফ্লাভিওকে শেষবার দেখা গিয়েছিল। এরপর মঙ্গলবার গভীর রাতে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। তিনি কীভাবে বা কখন সীমান্তে পৌঁছালেন, কিংবা ওই সময়ে কোথায় ছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আর্জেন্টিনার একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ফুটেজে দেখা যায়, দুটি ভ্যান সীমান্ত চেকপয়েন্ট পার হচ্ছে। পরে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মীরা সেগুলোকে বিমানবন্দরের দিকে নিয়ে যান।

আর্জেন্টিনার সংবাদপত্র পাগিনা/১২ জানিয়েছে, ফ্লাভিওর ব্যবহৃত বিমানটি ব্যবসায়ী সার্জিও ড্যানিয়েল মাস্ত্রোপিয়েত্রোর মালিকানাধীন। হাভিয়ের মিলেই প্রশাসনের অন্যতম বড় কেলেঙ্কারির ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। ওই ঘটনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল।

ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে অন্তত দুটি ফৌজদারি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় সন্দেহ করা হচ্ছে, বাজি ধরার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৮০ মিলিয়ন পাউন্ড বা ৯০৫ মিলিয়ন ডলার অর্থ পাচারের প্রক্রিয়ায় তিনি যুক্ত ছিলেন।

এই মামলার সূত্র ধরে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই ব্রাজিলের পুলিশ সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফ্লাভিওর পাসপোর্ট জব্দের আবেদন জানায়। তাদের আশঙ্কা ছিল, তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন। এ আশঙ্কার পেছনে পুলিশ গত শুক্রবার তাঁর ভাই ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য এদুয়ার্দো বলসোনারোর দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি পডকাস্টে কথা বলার সময় এদুয়ার্দো বলেছিলেন, আমার ভাই নির্বাচনে হেরে গেলে পরাজয় স্বীকার করা উচিত নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসা উচিত। এদুয়ার্দো বর্তমানে স্বেচ্ছানির্বাসনে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং লুলার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে তদবির করছেন।

ও গ্লোবো পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরাজয়ের সম্ভাবনা মাথায় রেখে কয়েক সপ্তাহ আগেই দেশত্যাগের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এদুয়ার্দো ছিলেন এই পরিকল্পনার মূল সংগঠক। ফ্লাভিওকে গ্রহণ করার বিষয়ে তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন।

ব্রাজিলে ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া বা দণ্ডপ্রাপ্ত বলসোনারো-সমর্থকদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাইর বলসোনারোর ঘনিষ্ঠ প্রায় এক ডজন রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি একইভাবে দেশ ছেড়েছেন।

২০২২ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর জাইর বলসোনারো নিজেও তিন মাস ফ্লোরিডায় কাটিয়েছিলেন। পরে ব্রাজিলে ফিরে আসেন তিনি। অভ্যুত্থানচেষ্টার দায়ে বিচারের মুখোমুখি থাকা অবস্থায় ব্রাসিলিয়ায় হাঙ্গেরির দূতাবাসে দুই রাত কাটান সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। তখন দূতাবাসটি তাঁর মিত্র হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সরকারের অধীন ছিল।

২৭ বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার পর গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় জাইর বলসোনারো তাঁর পায়ে পরানো ইলেকট্রনিক নজরদারি যন্ত্র বা অ্যাঙ্কল মনিটর নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে তিনি সোল্ডারিং আয়রন ব্যবহার করার চেষ্টা করেন।

আরও পড়ুন

×