পুতিনকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে সহায়তা করেছিলেন যিনি
সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা ভ্লাদিমির পুতিন, মস্কোর গ্র্যান্ড ক্রেমলিন প্রাসাদে- গেটি ইমেজেস
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩:০৯ | আপডেট: ২২ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৩:৩২
সোভিয়েত নিরাপত্তা সংস্থা-কেজিবির সাবেক কর্মকর্তা ভ্লাদিমির পুতিনকে ২০ বছর আগে রাশিয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুতিনকেই কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে ভ্যালেন্টাইন ইউমাশেভ নামে এক ব্যক্তির নাম, যিনি পুতিনের রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন।
ক্রেমলিনের কর্মকর্তা হয়ে ওঠা সাবেক সাংবাদিক ইউমাশেভ খুব কমই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তবে বিবিসিকে তিনি শুনিয়েছেন কেজিবির একজন কর্মকর্তা থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুতিনের উঠে আসার গল্প।
ইউমাশেভ ছিলেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের অন্যতম বিশ্বস্ত সহকারী। তিনি ইয়েলৎসিনের মেয়ে তাতিয়ানাকে বিয়ে করেন। ইয়েলৎসিনের চিফ অব স্টাফ হিসেবে ইউমাশেভ ১৯৯৭ সালে পুতিনকে ক্রেমলিনে প্রথম কাজ দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'ইয়েলৎসিনের বিদায়ী প্রশাসনের প্রধান আনাতোলি চুবাইস আমাকে বলেছেন, তিনি এমন একজন শক্তিশালী ম্যানেজারকে চেনেন, যিনি আমার জন্য একজন ভালো সহকারী তৈরি করে দেবেন।'
'তিনি আমাকে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং আমরা একসঙ্গে কাজ শুরু করি। আমি সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্য করেছিলাম- পুতিন কতটা দুর্দান্ত ও পারদর্শী। যে কোনো আইডিয়া প্রণয়নের ক্ষেত্রে কিংবা যে কোনো ঘটনার বিশ্লেষণ ও যুক্তি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি ভীষণ দক্ষ ছিলেন', যোগ করেন তিনি।

কখন তার মনে হয়েছিল পুতিন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে পারে এবং এমনটা ভাবার কোনো বিশেষ কারণ ছিল কি-না– এমন প্রশ্নের জবাবে ইউমাশেভ বলেন, 'ইয়েলৎসিনের মনে বেশ কয়েকজন প্রার্থীর নাম ছিল, যেমন বরিস নিমটসভ, সের্গেই স্টেপাশিন ও নিকোলাই আকসেনেনকো। ইয়েলৎসিন এবং আমি সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের নিয়ে অনেক আলোচনা করি। এক পর্যায়ে আমাদের মধ্যে পুতিনকে নিয়েও আলোচনা হয়।'
তিনি বলেন, 'ইয়েলৎসিন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন– পুতিন সম্পর্কে আমার ধারণা কী। জবাবে আমি বলেছিলাম- পুতিন একজন দুর্দান্ত প্রার্থী বলে আমি মনে করি। আমার মনে হয় আপনার তার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। পুতিন যেভাবে তার কাজগুলো করেন সেটা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, তিনি আরও কঠিন কাজের জন্য প্রস্তুত।'
১৯৯৯ সালের আগস্টে ভ্লাদিমির পুতিনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন বরিস ইয়েলৎসিন। এটি একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে পুতিনকে ক্রেমলিনের জন্য প্রস্তুত করছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন। তার ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ আরও এক বছর থাকলেও ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি তাড়াতাড়ি ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে চমকে দেন।

ইউমাশেভ বলেন, 'নববর্ষের তিন দিন আগে, পুতিনকে নিজের বাসভবনে ডাকেন ইয়েলৎসিন। তিনি আমাকে এবং তার নতুন চিফ অব স্টাফ আলেকজান্ডার ভোলোশিনকে উপস্থিত থাকতে বলেন। পুতিনকে তিনি (ইয়েলৎসিন) বলেছিলেন, তিনি জুলাই অবধি ক্ষমতায় থাকবেন না। সামনের ৩১ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করবেন।'
'আমি, ভোলোশিন, পুতিন ও ইয়েলৎসিনের মেয়ে তাতিয়ানা– এই হাতে গোনা কয়েকজন বিষয়টি জানতাম। এমনকি ইয়েলৎসিন তার স্ত্রীকেও এ বিষয়ে কিছু বলেননি', যোগ করেন তিনি।
ইয়েলৎসিনের পদত্যাগের বক্তব্য লেখার দায়িত্ব পেয়েছিলেন জানিয়ে ইউমাশেভ বলেন, 'তার এই বক্তব্য লেখা বেশ কঠিন ছিল। কারণ এটি স্পষ্ট ছিল যে, এই লেখাটি ইতিহাসে থেকে যাবে। কেননা এই বক্তব্য ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই আমি সেই বিখ্যাত লাইনটি লিখেছি– আমাকে ক্ষমা করুন।'
ইউমাশেভ বলেন, '১৯৯০-এর দশকে রাশিয়ানদের সেই ধাক্কা ও চাপ সহ্য করতে হয়েছিল। এ জন্য ইয়েলৎসিনকে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা ছিল বেশ জরুরি।'
নতুন বছর অর্থাৎ ১৯৯৯ সালের প্রাক্কালে, বরিস ইয়েলৎসিন তার চূড়ান্ত টেলিভিশন ভাষণটি ক্রেমলিনে রেকর্ড করেন। এ বিষয়ে ইউমাশেভ বলেন, 'সেখানে উপস্থিত সবার জন্য এই ঘোষণা ছিল বিশাল এক ধাক্কার মতো। একমাত্র আমি বক্তব্য লেখার কারণে অবাক হইনি। সবাই সেই ঘোষণা শুনে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। খুবই আবেগঘন মুহূর্ত ছিল সেটি।'
ভ্লাদিমির পুতিন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন। তিন মাস পরে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেন।

ভ্যালেন্টাইন ইউমাশেভকে প্রায়ই 'দ্য ফ্যামিলি'র সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই 'ফ্যামিলি' বা পরিবার বলতে বরিস ইয়েলৎসিনের অভ্যন্তরীণ গণ্ডির মধ্যে থাকা কয়েকজনকে বোঝানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই কয়েকজন ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে ইয়েলৎসিনের ওপর বেশ প্রভাব ফেলেছিলেন। যদিও ইউমাশেভ 'দ্য ফ্যামিলি'কে 'একটি মিথ, একটি মনগড়া আবিষ্কার' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তবে সন্দেহ নেই যে, ১৯৯০ এর দশকে প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিনের স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্বের সংকীর্ণ গণ্ডির ওপর তার আস্থা রেখেছিলেন। তবে পুতিনের অনুগামী লোকজন তার ওপর ওই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে না বলেই মনে করেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ভ্যালেরি সোলোভেই।
তার মতে, 'পুতিন দুই ধরনের লোকদের সামনে ঝুঁকে থাকেন: প্রথমত, তার শৈশবের বন্ধুদের সামনে, যেমন রোটেনবার্গ ভাই এবং যারা সোভিয়েত কেজিবিতে সেবা দিয়েছিলেন। তবে তিনি তাদের আনুগত্যে গলে যান না। ইয়েলৎসিন তার পরিবারের সদস্যদের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। পুতিন কারও ওপর নির্ভর করেন না।'
বরিস ইয়েলৎসিনের পর ভ্লাদিমির পুতিন ২০ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাশিয়ার ক্ষমতায় রয়েছেন। সেই সময় থেকে, তিনি এমন একটি ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছেন, যা তাকে ঘিরে আবর্তন করে।
ভ্যালেরি সোলোভেইয়ের মতে, 'ইয়েলৎসিন বিশ্বাস করেন যে, তার একটি মিশন ছিল এবং পুতিনেরও তাই আছে। ইয়েলৎসিন নিজেকে ত্রাতা মুসা হিসেবে দেখছেন: তিনি তার দেশকে কমিউনিস্ট দাসত্ব থেকে বের করে এনে শাসন করতে চেয়েছিলেন।'
তিনি বলেন, 'পুতিনের মিশন হলো, অতীতে ফিরে আসা। তিনি সোভিয়েতের পতনকে 'বিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়' উল্লেখ করে তার প্রতিশোধ নিতে চাইছেন। তিনি এবং তার গণ্ডির সাবেক কেজিবি কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের ধ্বংস পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার কাজ ছিল।'
তবে আজকের ভ্লাদিমির পুতিনকে কেউ উদারনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চেনেন না বলেই মনে করেন ইউমাশেভ। অবশ্য এ নিয়ে তার কোনো আফসোসও নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। ইউমাশেভ বলেন, 'এটা স্পষ্ট যে, রাশিয়ানরা এখনও পুতিনের ওপর বিশ্বাস রেখেছেন।'
তবুও, ইউমাশেভ মনে করেন, বরিস ইয়েলৎসিনের পদত্যাগ করা সব রাশিয়ান প্রেসিডেন্টের জন্য একটি শিক্ষা হিসেবে কাজ করবে, শিক্ষাটি হলো– 'পদত্যাগ করা এবং অল্প বয়সীদের জন্য পথ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েলৎসিনের জন্য এটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।'
