ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

রাতজাগা মানুষের ভোর

রাতজাগা মানুষের ভোর
×
×

শিল্পকর্ম: নাথান প্যাটারসন

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫২ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

অ্যালার্ম তিনবার বেজে থেমে গেছে। সকাল সাড়ে ৭টায় সন্তানের স্কুল, ৯টায় অফিস, মাঝখানে শহরের জ্যাম। অথচ শরীর বিছানা ছাড়তে চায় না। কড়া লিকারের দুই কাপ চা পেটে না পড়লে মাথা খোলে না। এ দেশে এমন মানুষের জন্য একটা তৈরি অপবাদ আছে– অলস। বিজ্ঞান অবশ্য অন্য কথা বলে। কে ভোরে চাঙা থাকবেন আর কে রাতে, তার অনেকটাই ঠিক করে দেয় শরীর নিজে।

ঘুম ও জাগার এই নিজস্ব ঝোঁকের নাম ক্রোনোটাইপ। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার ঘুমবিশেষজ্ঞ এম তারুজ আলী জানান, রাতজাগা স্বভাব মূলত জীববিজ্ঞানের ব্যাপার। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস নামে ছোট্ট একগুচ্ছ কোষ আছে। এটিই শরীরের প্রধান ঘড়ি। প্রায় ২৪ ঘণ্টার ছন্দে সে ঘুম, জাগরণ, শরীরের তাপমাত্রা, এমনকি হজমও নিয়ন্ত্রণ করে। জিনেরও ভূমিকা আছে।

ফলে কারও শক্তি ও মনোযোগ তুঙ্গে ওঠে সকালে, বিকেল গড়ালে ঝিমুনি ধরে। কেউ সকালে ঢিমেতালে চলেন, সন্ধ্যার পর জেগে ওঠেন পুরোদমে। অনেকে আবার মাঝামাঝি, দুদিকেই মানিয়ে নিতে পারেন।

বদলানো যায়, তবে সহজে নয়
জনস হপকিন্স কেরি বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ব্রায়ান গুনিয়া বলেন, মানুষ নিজের ক্রোনোটাইপ কিছুটা বদলাতে পারে, বদলায়ও। তবে তাঁর পরামর্শ, সুনির্দিষ্ট কারণ থাকলেই কেবল সে চেষ্টা করা উচিত। যেমন ছোট শিশুর দেখাশোনা কিংবা নতুন চাকরির সকালের হাজিরা। যে কৃষক ফজরের আজানে মাঠে নামেন, যে পোশাকশ্রমিক ৮টার আগে কারখানার গেটে পৌঁছান, তাদের তো বেছে নেওয়ার সুযোগই নেই। শর্ত একটাই–নিয়মে ফাঁকি চলবে না। সপ্তাহজুড়ে নিয়ম মেনে শুক্র-শনিবার দুপুর পর্যন্ত ঘুমালে পুরো চেষ্টাই জলে যায়।

সকালের রোদ, রাতের আঁধার
ঘড়ি এগিয়ে আনার সবচেয়ে জোরালো উপায় আলো। ডা. আলীর ভাষ্য, চোখের রেটিনায় পড়া আলোই দেহঘড়িকে নতুন করে মেলানোর সবচেয়ে শক্তিশালী সংকেত। যুক্তরাষ্ট্রের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা নিয়শের তথ্য বলছে, ঘুম ভাঙার এক ঘণ্টার মধ্যে আলো পেলে ফল মেলে সবচেয়ে বেশি।

এদিক থেকে আমরা ভাগ্যবান। রোদের দেশে এর জন্য খরচ নেই। ছাদে, বারান্দায় কিংবা গলির মোড় পর্যন্ত হেঁটে এলেই চলে। শীতপ্রধান দেশে এ কাজে ১০ হাজার লাক্সের বিশেষ বাতির সামনে ১০ থেকে ১৫ মিনিট বসতে হয়। ঘন কুয়াশার দিনে বা আলোহীন ফ্ল্যাটে সে পথও ভাবা যেতে পারে। 

রাতে নিয়ম উল্টো। সন্ধ্যার পর যে কোনো উজ্জ্বল আলো ঘড়িকে পিছিয়ে দেয়, বিশেষ করে মোবাইল ফোন আর সাদা এলইডি বাতির নীলচে আলো। ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে পর্দা থেকে চোখ সরানো ভালো। ঘরের আলোও কমিয়ে আনা দরকার। একান্তই ফোন দেখতে হলে নীল আলোর ফিল্টার চালু রাখা যায়।

ব্যায়াম, মেলাটোনিন, বাঁধা সময়
২০২৩ সালে কিউরিয়াস জার্নাল অব মেডিকেল সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, নিয়মিত মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম ঘুমের মান বাড়াতে এবং ঘুম আসার কষ্ট কমাতে পারে। তবে রাতের দিকে ভারী ব্যায়াম উল্টো ফল দিতে পারে। তাতে মেলাটোনিন নিঃসরণ পিছিয়ে যায়, ঘুম আসতে দেরি হয়।

সবচেয়ে জরুরি হলো ঘুমানো ও জাগার সময় বেঁধে ফেলা। বিয়েবাড়ি, রাতের বাসযাত্রা বা ঈদের ছুটিতে ছন্দ ভাঙতেই পারে। তখন আগে জাগার সময়টা ঠিক করুন। রাতে যখনই ঘুমান, সকালে উঠুন নির্ধারিত সময়ে। কয়েক দিন পর ঘুমাতে যাওয়ার সময় আধা ঘণ্টা করে এগিয়ে আনুন। রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১১টা, তারপর ১১টা।

ভোরে ওঠাই কি শ্রেষ্ঠ
কোনো ক্রোনোটাইপ বা দেহঘড়ি সেরা নয়। ২০২১ সালে স্লিপ অ্যাডভান্সেস সাময়িকীর এক গবেষণায় ভোরের মানুষের কার্যকর স্মৃতি তুলনামূলক ভালো পাওয়া গেছে। আবার গুনিয়া জানান, কিছু গবেষণায় রাতজাগাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য সামান্য বেশি দেখা গেছে। তবু বাস্তবে ভোরের মানুষই এগিয়ে থাকেন। পরীক্ষা শুরু হয় সকালে, অফিসের জরুরি সভাও বসে সকালে।

স্বাস্থ্যের হিসাবেও রাতজাগারা পিছিয়ে। তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি। ডা. আলী মনে করেন, এর বড় কারণ দেহঘড়ির সঙ্গে সকালমুখী সমাজের অমিল। সঙ্গে আছে দেরিতে ও অনিয়মে খাওয়া, অনিয়মিত ঘুম।

গুনিয়ার মতে, দেহঘড়ি পুরোপুরি পাল্টানো যায় না। রাতের মানুষ সকালে খানিকটা ক্লান্ত থেকেই যান। তাই শরীরের সঙ্গে লড়াই না করে কাজ সাজানো যায় নিজের ছন্দে। ২০২১ সালে নেচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ভোরে ওঠা মানুষ সকালে আর রাতজাগা মানুষ সন্ধ্যায় শেখা ও মনোযোগের কাজে ভালো করেন। সাইকোলজিক্যাল সায়েন্সে প্রকাশিত গুনিয়াদের আরেক গবেষণা বলছে, নৈতিক সিদ্ধান্তেও মানুষ সবচেয়ে সৎ থাকে নিজের সজাগ সময়ে।

ভোরে ওঠা তাই গুণ। তবে একমাত্র গুণ নয়। যার জীবিকা সকালে ডাকে, তিনি ঘড়ি এগিয়ে নিন রোদ আর নিয়মের জোরে। বাকিরা নিজের সেরা সময়টুকু চিনে নিলেই যথেষ্ট।

আরও পড়ুন

×