ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

জীবনের মানে খুঁজতে চাকরি ছাড়তে হয় না

জীবনের মানে খুঁজতে চাকরি ছাড়তে হয় না
×
×

ছবি- অতিথির সৌজন্যে

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সকাল ৮টায় মোহাম্মদপুর থেকে প্রতিদিনের বাসযাত্রা রাকিমুলের। তিনি শান্তিনগরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। প্রতিদিনের এ ক্লান্তিকর যাত্রায় অনেকের মতো রাকিমুলের মনেও নানা প্রশ্ন আসে। এই যে রোজ ছুটছি, এর মানে কী? মাস শেষে বেতন আসে, বাসা ভাড়া যায়, বাজার হয়। তবু কোথাও একটা ফাঁকা লাগে। মনে হয়, চাকরিটা ছেড়ে একেবারে অন্য কিছু শুরু করলে হয়তো জীবনটা অর্থপূর্ণ হতো।

করোনার দিনগুলো এই প্রশ্নকে আরও ধারালো করেছিল। এ সময়ে অনেকে নিজের কাজের দিকে নতুন করে তাকিয়েছেন। কেউ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরেছেন, কেউ চাকরি ছেড়ে ব্যবসা ধরেছেন, কেউ আপনজনের কাছাকাছি থাকার পথ খুঁজেছেন। বিশ্বজুড়ে এমনটা হয়েছে। 

হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক জুলিয়ান ডি ফ্রেইটাস বলছেন, মহামারি মানুষকে ভাবতে বাধ্য করেছে, তাঁর কাজ আদৌ অর্থপূর্ণ কিনা। কেউ নিজের কাজকে জরুরি ত্রাণকাজের পাশে রেখে দেখেছেন, তাতে নিজের কাজ বড় তুচ্ছ ঠেকেছে। কেউ অফিসের সঙ্গ আর আড্ডা হারিয়ে টের পেয়েছেন, কাজটা নিজে তাঁকে কখনও তৃপ্তি দেয়নি। কিন্তু জীবনের মানে পেতে কি এত ওলটপালট লাগে? ডি ফ্রেইটাস, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল প্রিনজিং ও নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বারবারা ফ্রেডরিকসন ছয়টি পরীক্ষায় এর উত্তর খুঁজেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ‘জার্নাল অব পজিটিভ সাইকোলজি’তে। উত্তরটা স্বস্তির। জীবনের মানে আসতে পারে ছোট ছোট জিনিস থেকেও, এমনকি অন্যের চোখে যা অকাজ, তা থেকেও। শর্ত একটাই, কাজটা যেন মন ভরায়।

গবেষকরা অর্থপূর্ণ জীবনের দুটি উপাদান ধরে এগিয়েছেন। একটি তৃপ্তি, অন্যটি অবদান। প্রায় ৪০০ মানুষকে তারা আরিয়ানা নামে এক কাল্পনিক রেস্তোরাঁ মালিকের গল্প শোনান। এক গল্পে আরিয়ানা নিজের কাজ ভালোবাসেন, আরেকটিতে ঘৃণা করেন। এক গল্পে তিনি এলাকার গৃহহীন মানুষকে খাবার দেন, আরেকটিতে রাতে একা বসে খান।
কাজে আনন্দ না পেয়েও সমাজের জন্য কিছু করলে ৭৪ শতাংশ মানুষ তাঁর জীবনকে অর্থপূর্ণ বলেছেন। আবার সমাজের জন্য কিছু না করেও কাজে আনন্দ পেলে ৯০ শতাংশ একই কথা বলেছেন। অর্থাৎ দুটি উপাদান আলাদাভাবে জীবনকে মানে দেয়।

ধরা যাক, কেউ সারাদিন পাড়ার দালানের ইট গোনেন। লোকে বলবে পাগলামি। ওই গবেষণায় নাওমি নামের এক চরিত্র ঠিক এ কাজই করতেন। তবু ৬৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, কাজটা করে তিনি সুখী হলে তাঁর জীবন অর্থপূর্ণ। অথচ নাওমি যখন দালান রং করার মতো কাজ করেন তখন কিন্তু আনন্দ পান না, তখন মাত্র ৩৬ শতাংশ তাঁর জীবনকে অর্থপূর্ণ মনে করেছেন। ডি ফ্রেইটাসের কথায়, প্রভাব ব্যাপারটা আপেক্ষিক। ছবি আঁকতে গিয়ে মন ভরে উঠতে পারে, যদিও ছবিটা হয়তো একেবারেই যাচ্ছেতাই।

আমাদের চারপাশেও এমন মানুষ কম নেই। অফিস থেকে ফিরে কেউ ছাদ বা বারান্দায় গাছের যত্ন নেন। কেউ পুরোনো ডাকটিকিট সংরক্ষণ করেন। কেউ পশু-পাখিদের খাওয়ান। কেউবা ছুটির দিনে ছবি তুলতে বেরিয়ে পড়েন। এসবে পদোন্নতি, ওভারটাইম নেই। আছে মনের আনন্দ।

ওই গবেষণার শেষ পরীক্ষায় আরিয়ানা এক লাভজনক ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা। এক গল্পে তিনি চড়া দামের ওষুধের দাম কমান, আরেকটিতে দাম বাড়িয়ে রোগীদের ঋণের দিকে ঠেলে দেন। দাম বাড়ানো আরিয়ানার জীবনকে অর্থপূর্ণ বলেছেন মাত্র ১৯ শতাংশ আর দাম কমানো আরিয়ানা নিজে তৃপ্ত না হলেও ৮৩ শতাংশ তাঁর জীবনে মানে খুঁজে পেয়েছেন।

কর্মক্ষেত্রের জন্যও এখানে ভাবার কথা আছে। কর্মী ও ব্যবস্থাপক দুজনেই কাজের প্রভাবকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু কোনটা প্রভাব, তা নিয়ে দুজনের হিসাব মেলে না। তাই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য এবং সেখানে তাঁর ভূমিকা বুঝিয়ে বলা দরকার।

আমাদের পোশাক কারখানার অপারেটর জানেন দিনে কত পিস সেলাই করতে হবে। ব্যাংকের কর্মী জানেন মাস শেষের টার্গেট কত। জানেন না, তাঁর খাটুনি কার জীবনে কী পরিবর্তন আনতে পারছে। যে মানুষ নিজের ঘামের ঠিকানা জানে না, তার কাছে কাজ শুধুই বোঝা। অথচ গবেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, জীবনকে অর্থপূর্ণ মনে করা মানুষের শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে। ভালো কর্মী ধরে রাখতে চাইলে প্রতিষ্ঠানেরও এতে লাভ।

এ দেশে একটা চাকরির পেছনে পুরো সংসার দাঁড়িয়ে থাকে। পছন্দের নয় এমন চাকরিও যদি কারও উপকারে লাগে, তার মানে আছে। কারও কাজে না লাগা শখেরও মানে আছে, যদি তা মন ভরায়। দুটোই পেলে ভালো। যদি একটাকেই বেছে নিতে হয়? যা আপনাকে সুখী করে, সেটাই নিন। চাকরিটা থাকুক। সন্ধ্যায় ফিরে নিজের মনের ইচ্ছেগুলো নিয়ে ভাবতে ভুলবেন না।

আরও পড়ুন

×