নদীর ওপারে রাজবাড়ি ঘরে নাড়ুর ঘ্রাণ
ছবি :: শারমিন চৌধুরী
সঞ্জয় দেবনাথ
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাবার চাকরির সুবাদে আমার পুরো শৈশব কেটেছে চট্টগ্রামের বাইরে। অথচ শিকড় চট্টগ্রামেই। পরে নিজের মাটির ভাষা আর সংস্কৃতি রপ্ত করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এ নিয়ে বিব্রতও হয়েছি অনেকবার। এখন বুঝি, ব্যাপারটা ততটা সরল নয়। মানুষের ভিত তৈরি হয় শৈশবে। যে পরিবেশে সে বড় হয়, যা দেখে আর শেখে, বাকি জীবন দাঁড়িয়ে থাকে তারই ওপর।
দুর্গাপূজায় বাবা ছুটি পেতেন কম। তাই বেশির ভাগ বছর চট্টগ্রামে ফেরা হতো না। আমাদের উৎসব-পার্বণ কাটত বাবার কর্মস্থলের শহরেই। নিজের মাটি ছেড়ে দূরে পূজা কাটানো মা-বাবার জন্য হয়তো কষ্টের ছিল। আমরা ভাইবোনেরা সে কষ্ট টের পাইনি। আমাদের শৈশবের শুরুই তো ওখানে। ওই শহরই ছিল ঘর, ওই পূজাই ছিল নিজের পূজা।
এখনও ঢাকের শব্দ কানে এলে মন নেচে ওঠে। স্মৃতিরা পাখির মতো ডানা মেলে। সবার আগে মনে পড়ে পুরোনো রাজবাড়িটার কথা। নদীর এপারে আমাদের বাসা, ওপারে রাজবাড়ি। রাজা নেই, রাজত্ব নেই, জৌলুসও নেই। তবু কি সত্যিই কিছু নেই? মানুষ তো আছে। মানুষ থাকলে সবই থাকে।
পূজা এলে সেই জীর্ণ বাড়ি আবার সত্যিকারের রাজার বাড়ি হয়ে উঠত। চারপাশ লোকে লোকারণ্য। শুধু পুণ্যার্থীরা আসতেন তা নয়। হরেক রকম মানুষের পায়ের শব্দে মুখর হয়ে থাকত পুরো এলাকা। ছোট দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসতেন। কারও কাছে খেলনা, কারও কাছে বাদাম, বুট, খাজা। কোথাও চটপটি। আরও কত কী! ওই কদিন সেখানে সত্যিই একটা রাজত্ব চলত। রাজার নয়, সম্প্রীতির।
ঘরের ভেতরে চলত আরেক আয়োজন। নারকেলের নাড়ু, মুড়ি আর গুড়ের মোয়া। সময় নিয়ে, আয়েশ করে বানানো হতো। মুখে দিলে অমৃত মনে হতো। পূজার স্মৃতি বলতে আজও আগে ওই নাড়ু-মোয়ার কথাই মনে আসে। তবে খাবারের ঘ্রাণের চেয়ে বড় ছিল মিলেমিশে থাকার ঘ্রাণ। পূজার নাড়ু খাওয়া যাবে কি যাবে না–এ নিয়ে ফতোয়ার ছড়াছড়ি তখন ছিল না। খাবার ছিল খাবারই। উৎসব ছিল সবার।
এখনকার ছবিটা অন্য রকম। পূজা এলে আনন্দের পাশাপাশি একটা আতঙ্কও বুকে চেপে বসে পাথরের মতো। আয়োজনটা ঠিকঠাক শেষ হবে তো? কোথাও কোনো হাঙ্গামা বাধবে না তো? সরকারি হিসাবে এবার সারাদেশে পূজা হচ্ছে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে। গতবারের চেয়ে প্রায় দেড় হাজার বেশি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ঝুঁকির কোনো তথ্য নেই। খবরটা স্বস্তির। তবু মণ্ডপ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এত সদস্য দেখলে মনটা খচখচ করে। যে উৎসবকে এত পাহারায় রাখতে হয়, সেই উৎসব আর সেই লোকালয় আসলে কতটা নিরাপদ? পাহারা হামলা ঠেকাতে পারে। মনের ভয় তাড়াতে পারে না। ভয় তাড়ায় পাশের বাড়ির মানুষ।
ভয়ের কারণও অমূলক নয়। প্রযুক্তিকে ষড়যন্ত্রের কাজে লাগিয়ে তিলকে তাল বানানো, গুজব রটিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটানোর নজির আমাদের সময়েই অগুনতি। একটা পোস্ট যাচাই হওয়ার আগেই ভিড় জমে যায়। তারপর যা ঘটে, তা আর ফেরানো যায় না। আমাদের শৈশবে প্রযুক্তির এই রমরমা ছিল না। উৎসব পণ্ড করার নোংরামিও ছিল না। ধর্মীয় অনুষ্ঠান মানেই ছিল সম্প্রীতির সুবাতাস, একসঙ্গে থাকার উপলক্ষ।
আরেকটা বদল চোখে লাগে। রাজবাড়ির ওই মেলার ভিড়ে ছোটখাটো চুরি নিশ্চয়ই হতো। কিন্তু সামান্য জিনিস চুরির অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার খবর আমরা শুনিনি বললেই চলে। এখন তা অহরহ ঘটছে। তখন কি চুরি হতো না? নাকি হতো, মানুষ এতটা নির্মম ছিল না?
প্রশ্নটা আমাকে আবার শৈশবের কাছে ফিরিয়ে নেয়। শৈশবই যদি মানুষের ভিত হয়, তবে আজ যে শিশু পাহারার ভেতর দিয়ে মণ্ডপে ঢুকছে, তার ভিতে কী জমা হচ্ছে? আমরা পেয়েছিলাম খোলা মাঠ, ভিড়ের ভরসা আর নাড়ুর ঘ্রাণ। সে পাচ্ছে তল্লাশি আর সতর্কতা। উৎসবকে সে চিনছে ঝুঁকির নামে। এই ক্ষতি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এক প্রজন্ম পরে এর দাম দিতে হয়।
আমাদের শৈশবের সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল শান্তি। শান্তি আর আনন্দ এমন জিনিস, ভাগ করে নিলে বাড়ে। এর জন্য হানাহানির দরকার হয় না। দরকার শুধু পাশের মানুষটাকে মানুষ ভাবা। নদীর ওপারের ভাঙা রাজবাড়িটা আমাকে এ কথাই শিখিয়েছিল। রাজা না থাকলেও চলে। মানুষ থাকলে সবই থাকে।
- বিষয় :
- সঞ্জয় দেবনাথ
- দুর্গাপূজা
- স্মৃতিচারণ
- জীবনের গল্প