শিশুকে কাশির সিরাপ দেওয়ার আগে সতর্কতা
ছবি: সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:১৭
শিশুর কাশি হলে দ্রুত উপশমের জন্য অনেক বাবা-মা কাশির সিরাপ দেন। কিন্তু সব কাশির সিরাপ সব বয়সী শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। এসব সিরাপে একাধিক সক্রিয় উপাদান থাকতে পারে। আবার শিশুকে দেওয়া অন্য কোনো ওষুধেও একই উপাদান থাকতে পারে। ফলে অজান্তেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় ওষুধ খাওয়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
তাই কাশির সিরাপ কেনার সময় শুধু ব্র্যান্ডের নাম নয়, বোতলের গায়ে লেখা সক্রিয় উপাদান, বয়সসীমা ও মাত্রা দেখে নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা যে পাঁচটি উপাদানের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন, সেগুলো হলো—ডেক্সট্রোমেথরফান, কিছু অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যালকোহল, প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন এবং কোডিন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, একই উপাদানযুক্ত একাধিক ওষুধ একসঙ্গে দেওয়া হলে বা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি দেওয়া হলে শিশুর ক্ষতি হতে পারে। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের বেশিরভাগ সংক্রমণ সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। সাধারণ ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশিতে ওষুধের উল্লেখযোগ্য উপকারের প্রমাণও সীমিত।
ডেক্সট্রোমেথরফান
ডেক্সট্রোমেথরফান কাশি কমানোর একটি ওষুধ। এটি মস্তিষ্কের কাশি নিয়ন্ত্রণকারী অংশে কাজ করে। অনেক কাশির সিরাপে এই উপাদান থাকে। তবে সাধারণ ভাইরাসজনিত কাশিতে শিশুদের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ‘পেডিয়াট্রিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত ১০০ শিশুকে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, রাতে কাশি কমানো বা ঘুমের মান উন্নত করার ক্ষেত্রে ডেক্সট্রোমেথরফান বা ডাইফেনহাইড্রামিন—কোনোটিই প্লাসিবোর তুলনায় বেশি কার্যকর ছিল না। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ডেক্সট্রোমেথরফানের কিছু উপকার পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শিশুর বয়স, উপসর্গ ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এর ব্যবহার নির্ধারণ করা উচিত। কাশি বেশি হলেই ওষুধের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
ঘুমপাড়ানি অ্যান্টিহিস্টামিন
প্রোমেথাজিন ও ডাইফেনহাইড্রামিনের মতো কিছু অ্যান্টিহিস্টামিন কাশি ও সর্দির ওষুধে থাকতে পারে। এগুলো শিশুকে তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ঘুমঘুম করে তুলতে পারে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়া মানেই কাশি ভালো হওয়ার প্রমাণ নয়। খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের অ্যান্টিহিস্টামিন বা ডিকনজেস্ট্যান্টযুক্ত সর্দি-কাশির ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক করেছে। এসব ওষুধে গুরুতর, এমনকি জীবনহানিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঘটনাও রয়েছে।
অ্যালকোহল
কিছু তরল ওষুধে দ্রাবক বা সহায়ক উপাদান হিসেবে ইথানল বা অ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়। তাই শিশুকে একাধিক ওষুধ দেওয়ার সময় প্রতিটির লেবেল দেখে নেওয়া দরকার। ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি জানিয়েছে, অ্যালকোহলযুক্ত ওষুধ ছোট শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একাধিক এমন ওষুধ একসঙ্গে দেওয়া হলে শরীরে অ্যালকোহল জমার ঝুঁকিও থাকে। তবে অল্প পরিমাণ অ্যালকোহল থাকা প্রতিটি ওষুধই যে বিপজ্জনক, এমন নয়। শিশুর বয়স, ওজন এবং ওষুধে অ্যালকোহলের পরিমাণ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন
কিছু কাশি ও সর্দির সিরাপে জ্বর বা ব্যথা কমানোর ওষুধও থাকে। যেমন প্যারাসিটামল বা কিছু ফর্মুলেশনে আইবুপ্রোফেন। এখানে সমস্যা হতে পারে একই ওষুধ দুইবার দেওয়া। যেমন, কাশির সিরাপে প্যারাসিটামল থাকার পরও জ্বরের জন্য আলাদা প্যারাসিটামল দেওয়া হলে শিশুর অজান্তেই অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ খাওয়া হয়ে যেতে পারে। তাই কাশির সিরাপ দেওয়ার আগে এতে প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন বা অন্য কোনো জ্বর-ব্যথার ওষুধ রয়েছে কি না, তা দেখে নিতে হবে।
কোডিন
কোডিন একটি ওপিওয়েড জাতীয় ওষুধ। এটি শরীরে মরফিনে রূপান্তরিত হয়। তবে একেকজনের শরীরে এই প্রক্রিয়া একেকভাবে হয়। ফলে কিছু শিশুর শরীরে বেশি পরিমাণ মরফিন তৈরি হয়ে গুরুতর শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাশি ও সর্দির জন্য কোডিনযুক্ত ওষুধ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিশুদের কাশির চিকিৎসায় কোডিনের কার্যকারিতার পক্ষেও শক্ত প্রমাণ খুব বেশি নেই।
কাশির ওষুধে সতর্কতা
শিশুদের কাশি ও সর্দির ওষুধ ব্যবহারে সাম্প্রতিক সময়ে বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়েছে। ক্লোরফেনিরামিন ম্যালেট ও ফিনাইলেফ্রিন হাইড্রোক্লোরাইড যুক্ত সব ধরনের নির্দিষ্ট মাত্রার মিশ্রণ বা চার বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এসব ওষুধের লেবেল, প্যাকেজ ইনসার্ট ও প্রচারসামগ্রীতে চার বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ব্যবহার না করার সতর্কবার্তা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই দুই উপাদানের একটি হলো অ্যান্টিহিস্টামিন এবং অন্যটি ডিকনজেস্ট্যান্ট।
বাবা-মায়ের করণীয়
মধুকর রেইনবো চিলড্রেনস হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি ও হেপাটোলজি বিভাগের পরামর্শক ডা. রোহান গ্রোত্রার মতে, সবচেয়ে নিরাপদ ওষুধ মানেই সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ নয়। শিশুর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় যে ওষুধ দেওয়া হয়, সেটিই বেশি নিরাপদ। দিল্লির সিকে বিড়লা হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক্স ও নিওনাটোলজি বিভাগের পরামর্শক ডা. অদিতি সচদেবাও শুধু ব্র্যান্ডের নামের ওপর নির্ভর না করে ওষুধের উপাদান পড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ছোট শিশু, বিশেষ করে নবজাতক ও টডলারদের কাশি বা সর্দির ওষুধ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণ ভাইরাসজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তরল পান করানো, নাক বন্ধ থাকলে স্যালাইন নেজাল ড্রপ ব্যবহার এবং ঘরের বাতাসে আর্দ্রতা বজায় রাখার মতো সহায়ক ব্যবস্থাই অনেক সময় যথেষ্ট হতে পারে। মনে রাখতে হবে, কাশি কোনো রোগ নয়, এটি একটি উপসর্গ। সবসময় কাশি দমন করার প্রয়োজনও নেই।
কাশির সিরাপ দেওয়ার আগে ওষুধের সক্রিয় উপাদান, বয়সসীমা ও মাত্রা দেখে নিন। একই উপাদান অন্য কোনো ওষুধে রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করুন। বিশেষ করে কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কাশি ও সর্দির ওষুধ না দেওয়াই নিরাপদ।
সূত্র: এনডিটিভি
- বিষয় :
- শিশু
- স্বাস্থ্য
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা