ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

মুজিববর্ষ

যে বঙ্গবন্ধু জবু দোকানদারেরও

যে বঙ্গবন্ধু জবু দোকানদারেরও
×

হারুন হাবীব

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২০ | ০৭:২৫

১৯৭৩ কিংবা তার পরের বছরের কথা। দেওয়ানগঞ্জের খড়মা গ্রামের জবু দোকানদার তখনও হাল ছাড়েননি। গ্রামের বাড়ি গেলে কোনো না কোনোভাবে খবর পেয়ে যান এবং আমাদের বাড়ির সামনে বসে থাকেন, যে পর্যন্ত না আমার সঙ্গে তার দেখা হয়। তার একটাই দাবি, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করবেন এবং ঢাকাতে তার জানাশোনা লোক একমাত্র যখন আমিই, কাজেই আমার কাছে এসে ধরনা দেন। জানতে চান, কিছু হলো কিনা।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে সবেমাত্র পেশাগত সাংবাদিকতায় ঢুকেছি। তদানীন্তন বিপিআই বা বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল নামের ছোট্ট সংবাদ সংস্থায় কাজ করি। সংস্থায় রিপোর্টার বা জনবল কম বলে সম্পাদক মীজানুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অনুষ্ঠান 'কভার' করতে আমাদের মতো নবীনদেরই দায়িত্ব দেন। অতএব, আমারও সুযোগ হয় বঙ্গবন্ধুর কিছু অনুষ্ঠানে যাওয়ার। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অজপাড়াগাঁয়ের এবং সম্পূর্ণ অজ্ঞাত এক ব্যক্তিকে আমি দেখা করাতে পারি! কিন্তু জবু কাকা আমার সংকট বুঝবেন না। তার কথা, তিনি বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের সৈন্যরা যখন গ্রেপ্তার করে, সেদিনকার পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়, সেদিন থেকে তিনি নফল নামাজ পড়া শুরু করেন এবং জাতির পিতা দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি নামাজ পড়ে গেছেন।

শুধু তাই নয়, আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন জবু দোকানদার। প্রায় নিরন্ন, এলাকার ছোট বাচ্চাদের মাঝে মুড়িমুড়কি ও বাদাম-লজেন্স বিক্রি করে যে মানুষ জীবনধারণ করে, সেই জবু কাকা মানত করেছিলেন পাকিস্তান থেকে বঙ্গবন্ধু বেঁচে দেশে ফিরে এলে তিনি একটা গরু জবাই করে গরিবদের মাঝে গোশত বিতরণ করবেন। প্রচণ্ড আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও সে কাজটি তিনি সমাধা করেন।

অতএব, আমার বাল্যস্মৃতির অনেকটা জায়গাজুড়ে যে জবু দোকানদার, তার প্রতি সহমর্মিতা বোধ করি বৈকি। এরপরও জানি, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা আমার কাজ নয়। অতএব, তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। একসময় উপায়ান্তর না দেখে সেদিনের বিপিআই সংবাদ সংস্থা থেকে বঙ্গবন্ধুর সেই অসামান্য ভক্তকে নিয়ে একটা ছোট্ট প্রতিবেদন লিখি, ছাপাও হয় এক-দুটি দৈনিকে। খবরটি প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া বিভাগের কারও না কারও চোখে পড়ে। হয়তো সে কারণেই জবু দোকানদারের আশার পূরণ ঘটে। শুনেছিলাম, তিনি বঙ্গবন্ধুকে সামনাসামনি দেখার সুযোগ পান।

নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, জবু দোকানদারের মতো গ্রামবাংলার অগণিত সাধারণ এবং অতিসাধারণ মানুষের গভীর ভালোবাসার পাত্র হতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের জাতির পিতা। জবু দোকানদারের মতো মানুষ, যারা দিনের সামান্য উপার্জনে সংসার-ধর্ম পালন করেছেন, সামান্য দোকানদার কিংবা দিনমজুর, তারা নিজেদের জীবনকে, বলা যায় উৎসর্গ করেছিলেন তাদের শেখ সাহেবের জন্য। এই যে ভালোবাসা এর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ভালোবাসেন, মুক্তিযুদ্ধকে যারা অন্তর থেকে গ্রহণ করেন, তারাই বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে ভালো না বেসে যারা দেশকে ভালোবাসেন বলেন, তাদের উচ্চারণে আমার বিশ্বাস নেই। কারণ বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সমার্থক, একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করার সুযোগ নেই।

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের মানুষ এবং যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি ও নিশ্চিতভাবেই যা বলে যাব জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতেও, সেই আমরা অনেকেই সারাদেশ ঘুরে বেড়াই। যাই ছোট-বড় শহর-বন্দর ও গ্রামে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারীদের পক্ষে, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করি। উদার, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জনমানুষের সমর্থন কামনা করি। কারণ, আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশ চাই, আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যে, বাংলাদেশ নিঃশর্তভাবে বঙ্গবন্ধুকে, জাতির পিতাকে, মুক্তিযুদ্ধকে গ্রহণ করবে। ১৯৭৫-এর পর সামরিক ও আধা-সামরিক যে রাষ্ট্রশক্তি রাষ্ট্রপিতা ও মুক্তিযুদ্ধকে আঘাত করেছে, অপমানিত করেছে, আমরা চাই না, সেই অপশক্তির কাছে লাখো শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশ ফিরে যাক।

অনেকেই হয়তো ভুল করে বসেছিলেন এই ভেবে যে, মুক্তিযুদ্ধ আর কখনোই জেগে উঠবে না; জাতি আর কখনোই লাখো শহীদের ডাক শুনতে পাবে না, শুনবে না একাত্তরের লাখো নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ। কিংবা এমনটিও হয়তো ভেবে বসেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক-দালালদের, পঁচাত্তরের কুশীলব ও তাদের সমর্থকদের মুখ ভুলে গেছে মানুষ। কিন্তু আমার দৃঢ় আস্থা- মহান মুক্তিযুদ্ধ, এতকাল পরেও নতুন করে তার স্বমহিমায় দীপ্যমান হয়ে উঠেছে। মুখোশের আড়ালে যারা একাত্তরের পরাজিত সেই অপশক্তিকে আশ্রয় দিয়েছেন বা এখনও দিয়ে চলেছেন, সৌভাগ্য যে, তাদের মুখগুলোও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ২০২০ সালে এসেও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়েছে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়- কেউই একসময় ভাবতে পারেননি যে, বাংলাদেশের মাটিতে কখনও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেই ভাবনা সত্য প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রপিতার হত্যাকাণ্ডের বিচার ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এমনকি বিচার ঠেকানো যায়নি একাত্তরের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদেরও। দেরিতে হলেও ইতিহাসের অমোঘ সত্যগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ন্যায়বিচারের পথে বাংলাদেশ অনেকখানি অগ্রসর হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের বৃহৎ অংশ  মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের প্রতি আস্থাশীল হয়েছে।

রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি গুণগত পরিবর্তন অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। পুরোনো ব্যর্থতা ও কলঙ্ক থেকে বেরিয়ে এসে নতুনের উপলব্ধিতে সিক্ত হওয়া সময়ের দাবি। পরিবর্তনের এ প্রার্থিত ধারা জাতীয় রাজনীতিতে সমূহ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে, জাতীয় ঐক্যের পথে বড় বাধাটি দূর করতে পারে। এ পরিবর্তনের মূল শর্ত- অতীতের কলঙ্ক ঝেড়ে ফেলে নিঃশর্তভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ঐতিহাসিক মহিমায় গ্রহণ করা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাসকে পরিপূর্ণ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা। যে বা যারা এই অতিন্যায্য কাজগুলো করতে ব্যর্থ হবেন, তিনি বা তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বিশ্বাসী হতে পারেন না।

রাজনীতিতে সরকারের সমালোচনা বা বিরোধিতা অপরাধ কিছু নয়, বরং তা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার। অপরাধ হচ্ছে, সরকার-বিরোধিতার নামে জাতির পিতাকে অবজ্ঞা করা, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উপেক্ষা করা, বিতর্কিত করা এবং রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে আঁতাত করে জাতির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও রক্তস্নাত ইতিহাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। অতএব, নিঃশর্ত এবং পরিপূর্ণ আবেগ ও শ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রহণ করতে হবে, মুক্তিযুদ্ধকে বুকে ধারণ ও লালন করতে হবে। আমরা চাই- এই বাংলাদেশে আর কখনোই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে কেউ থাকবে না। আমাদের সরকার হবে মুক্তিযুদ্ধপন্থি, বিরোধী দল- সরকার সব হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর কর্মসূচি চলছে দেশে। কিন্তু পঁচাত্তরের রক্তপাতের সমর্থকরা জাতীয় রাজনীতির সঠিক উপলব্ধিতে আজও কি আসতে পেরেছে? সবাইকে পূর্ণ উপলব্ধিতে বুঝতে হবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ কোনো দলের নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা, জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধুর যারা দলগত অনুসারী, তাদেরও উচিত হবে জাতির পিতাকে গণ্ডিবদ্ধ না করে, সর্বকালের সর্বশেষ্ঠ এই শুদ্ধতম জাতীয়তাবাদী ও শ্রেষ্ঠতম নেতাকে সর্বজনীন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। তাঁর আদর্শকে সত্যিকার মর্মে উপলব্ধি ও বেগবান করা।

আমার বিশ্বাস, টুঙ্গিপাড়ার কবরে শায়িত থেকেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ ও আগামীকালের জাতি-বিরুদ্ধ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য-বিরুদ্ধ  সব আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক, যেমনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থেকেও তিনি সর্বাধিনায়ক ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের।

মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

আরও পড়ুন

×