ইলিয়াস জাভেদ [১৯৪৪–২০২৬]
বিদায়, রুপালি পর্দার রাজকুমার
সাদিয়া মুনমুন
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলা ও উর্দু–দুই ভাষার সিনেমায় ছিল তাঁর রাজকীয় বিচরণ। নৃত্যশিল্পী ও নির্দেশক হিসেবে ছিলেন নন্দিত, আর অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ তারকার একজন; যার শিল্পীজীবন নিয়ে রচনা করা যায় রোমাঞ্চকর গল্প, সেই জাভেদ চলে গেলেন হঠাৎ করে; নিজেকে আড়ালে রেখে, নিভৃতে। দেশীয় চলচ্চিত্রের এই শক্তিমান অভিনেতা ও নৃত্যশিল্পীর এমন বিদায় সত্যি মেনে নেওয়া কঠিন। গতকাল সকাল ১১টায় উত্তরার নিজ বাসভবনে ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এই খবর সিনেমাপ্রেমী অনেকের কাছে ছিল কষ্টের। যদিও সংখ্যার দিক থেকে চলে যাওয়ার বয়সটা অনেকের কাছে স্বাভাবিক, কিন্তু কষ্টের বিষয়টি বয়স নয় বরং শেষ সময়ে চলচ্চিত্র জগতের সহযোদ্ধাদের সাক্ষাৎ না পাওয়া। জানা গেছে, সোনালি যুগের এই চিত্রতারকা দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। এই মরণব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে যাওয়ার দিনগুলোয় পরিবারের সদস্য ছাড়া আর কারও সঙ্গে খুব একটা সাক্ষাৎ ঘটেনি তাঁর। জাভেদের স্ত্রী অভিনেত্রী ডলি চৌধুরী শেষ সময়ের দৃশ্যটি তাঁর বয়ানে তুলে ধরেছেন এভাবে–‘‘অনেকদিন হাসপাতালে থাকার পর কিছুদিন আগে বাসায় নিয়ে আসা হয় ওকে [জাভেদ]। এরপর বাসাতেই নার্স রেখে চলছিল চিকিৎসা। আজ (বুধবার) সকালে নার্স এসে জানালো যে ওর খুব খারাপ লাগছে। সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে। এরপর আর এক মুহূর্ত দেরি করিনি। দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যাই, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। আমরা একবারও বুঝতে পারনি, কী দুঃসংবাদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। হৃদয় দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়া সেই দুঃসংবাদটি কানে এলো হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই। ডাক্তার পরীক্ষা করে এক বাক্য বলে দিলেন–জাভেদ আর নেই।’
ষাট থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত যারা ছিলেন বাংলা সিনেমার মুগ্ধ দর্শক, তাদের অনেকের প্রিয় একটি নাম জাভেদ। এক শব্দের এই নামই তাঁকে খ্যাতিমান করে তুলেছিল। যদিও তাঁর প্রকৃত নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস, তবে সেটি বদলে ইলিয়াস জাভেদ রেখেছিলেন সিনে দুনিয়ায় পা রাখার পর। তবে বেশির ভাগ সিনেমার পর্দায় এবং পোস্টার ও ব্যানারে তাঁর নামটি শুধু ‘জাভেদ’ লেখা হতো। যদিও নাম নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি, কারণ এই এক শব্দের নামটি তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল এবং বিশেষণ হিসেবে জুটেছিল পর্দার রাজকুমার খেতাব। অবশ্য এর পেছনে আরেকটি কারণ ছিল, অভিনয়ে ফোক, রূপকথা ও রাজকীয় পটভূমির সিনেমাকে প্রাধান্য দেওয়া। মূলত ‘মালকা বানু’, ‘শাহজাদী’, ‘নিশান’, ‘রাজকুমারী চন্দ্রভান’, ‘কাজল রেখা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’র মতো সিনেমাগুলো আলাদা পরিচিতি গড়ে দিয়েছিল জাভেদের। এর বাইরেও ‘অন্ধ প্রেম’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘অনেক দিন আগে’, ‘নরম গরম’, ‘আজও ভুলিনি’, ‘সতী নারী বিজলী’, ‘দিওয়ানা মন’, ‘রাখাল রাজা’, ‘রাঙা বাঈদানী’সহ আরও বেশ কিছু সিনেমায় অভিনয় করে দর্শক মনোযোগ কেড়েছিলেন। পাশাপাশি নৃত্যশিল্পী এবং নৃত্য নির্দেশক হিসেবে দেশীয় সিনেমায় তুলে ধরেছিলেন অভিনব পরিবেশনা। এক কথায়, চলচ্চিত্রে যতভাবে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া যায়, তার জন্য সবসময় নিবেদিত ছিলেন। তারপরও এই গুণী শিল্পীকে অজ্ঞাত অভিমানে চলে যেতে হয়েছিল সিনেমা অঙ্গন থেকে। শুধুই কী শারীরিক অসুস্থতা, নাকি অন্য কোনো অভিমানে দীর্ঘদিন বাংলা সিনেমার আঁতুড়ঘর বিএফডিসিতে তিনি পা রাখেননি–সে প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি এই অভিনেতার কাছে।
বাংলা সিনেমার ইতিহাস রচনা করতে গেলে জাভেদের নাম বড় হরফেই লিখতে হবে। কারণ দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্মলগ্ন থেকে দাপটের সঙ্গে কাজ করে গেছেন তিনি। জন্ম পাকিস্তানে হলেও তিনি নিজের জীবন, শিল্প আর ভালোবাসা উৎসর্গ করেছিলেন বাংলাদেশকে। শেষ পর্যন্ত এ দেশের মাটিতেই তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল, যে দেশকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন হৃদয়ের গভীর থেকে।
পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজার এলাকায় বসবাস করতেন জাভেদ। এলাকাবাসীর ভালোবাসা ও সম্মানে সেই মহল্লাটি একসময় পরিচিতি পায় ‘জাভেদ মহল্লা’ নামে। কারণ একটাই, সিনেমা জগতে অনবদ্য নাচ আর অভিনয় তুলে ধরে অগণিত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারা। একটু পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখি, ১৯৬৪ সালে উর্দু ছবি ‘নয়ি জিন্দেগি’ দিয়ে নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিল জাভেদের। তবে ১৯৭০ সালে মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘পায়েল’ সিনেমাটি তাঁকে এনে দিয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। নায়করাজ রাজ্জাক ও শাবানার সঙ্গে এই ছবিতে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে আসন পোক্ত করে নিয়েছিলেন জাভেদ। এরপর ‘নিশান’ সিনেমার মাধ্যমে নায়ক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা পৌঁছে যায় শীর্ষে। বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে অপরিহার্য নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। লোকগান হোক বা শহুরে গান–নায়ক-নায়িকাদের নাচে তিনি যোগ করেন ছন্দ, শরীরী ভাষা ও নাটকীয়তা। তাঁর হাত ধরেই বলা চলে বাংলা সিনেমার নাচে আসে এক নতুন যুগ। কবরী, শাবানা, ববিতা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, সুচরিতাসহ প্রায় সব শীর্ষ নায়িকা তাঁর কোরিওগ্রাফিতে পর্দা মাতিয়েছেন।
শুধু নায়িকা নন, রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, ওয়াসিম, ফারুক, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো নায়করা নাচ শিখেছেন তাঁর কাছ থেকে। নাচের গুরু হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি ছিলেন সবার গুরু ও শ্রদ্ধার পাত্র।
নায়ক বা কোরিওগ্রাফার–দুই পরিচয়েই তিনি ছিলেন সুপারস্টার। যদিও জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাঁকে ঘিরে আলোচনা ছিল কম, কিন্তু প্রকৃত শিল্পীরা কখনও ভুলে যাননি। শেষ বিদায়ে যারা হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা জানিয়ে রেখে একটি অব্যক্ত কথা–বিদায় রুপালি পর্দার রাজকুমার, পরপারে আপনি শান্তিতে থাকুন।
- বিষয় :
- ইলিয়াস জাভেদ
