ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

অপতথ্য এবং তথ্যসাক্ষরতা

অপতথ্য এবং তথ্যসাক্ষরতা
×

সময় এসেছে অপতথ্যের মুখোমুখি হওয়া এবং তথ্যসাক্ষর নাগরিক গড়ে তোলার।

শারীফ অনির্বাণ

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ | ০০:০৯ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৫ | ১৫:৪৭

প্রযুক্তি সভ্যতায় পৃথিবী প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তির কল্যাণে অভিনব সম্ভাবনা যেমন হাতছানি দিচ্ছে, তেমনি নেতিবাচকতা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার একটি হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ। এই তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে মানুষ যেমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তেমনি সমাজ বদলের রূপকার হয়ে উঠতে পারে। এর সুফল যেমন আছে, তেমনি অপব্যবহার ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের ভয়াবহ একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে অপতথ্য বা মিসইনফরমেশন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও অপতথ্য এখন আর নিছক একটি ডিজিটাল সমস্যা নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে একটি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সংকটে।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রবেশাধিকার সহজ হওয়ার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া যেমন– ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটক ইত্যাদি অপতথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে এক ধরনের ‘তথ্য সন্ত্রাস’-এর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। ডিডব্লিউ একাডেমির (২০২২) গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হলো ফেসবুক, যার মাধ্যমে ৭৫ শতাংশ ভুয়া খবর ছড়ানো হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে ব্যাকগ্রাউন্ড ভয়েস ও ছবি জুড়ে দিয়ে বিকৃত নিউজ বানিয়ে ছড়ানো হয়। আবার মূলধারার গণমাধ্যমের মতো কাছাকাছি নাম ব্যবহার করে ভুয়া নিউজ পোর্টাল তৈরি করে মনগড়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিকৃত সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে। এসব ভুয়া খবর মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দ্রুত। ফলে পরিচিত কেউ শেয়ার করলে মানুষ যাচাই না করেই বিশ্বাস করে ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছেন। ২০২৩ সালে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৬৭ শতাংশ কখনও না কখনও ভুয়া খবর শেয়ার করেছেন যাচাই না করেই। এর ফলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 
রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসেই বাংলাদেশে ৮৩৭টি অপতথ্যের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার ৪১ শতাংশ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যে কোনো পাবলিক ফিগার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, গোষ্ঠী, মতাদর্শ বা দলকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর চেয়েও বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই অপতথ্যের একটি বড় অংশ ছড়ানো হচ্ছে ফটোকার্ড, ভুয়া ভিডিও এবং নামসদৃশ নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে। 
এই সংকট থেকে উত্তরণের অন্যতম পথ হলো তথ্যসাক্ষরতা বা ইনফরমেশন লিটারেসি। তথ্যসাক্ষরতা বলতে বোঝায় তথ্য খোঁজা, যাচাই, বিশ্লেষণ ও সচেতনভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা। এটি এমন ধরনের দক্ষতা, যা ব্যক্তিকে কোনো তথ্য গ্রহণ করার আগে সেটি যাচাই, বিশ্লেষণ, যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করাসহ তথ্যের উৎস জানা ও সংশ্লিষ্ট উৎসকে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে শেখায়। একজন তথ্যসাক্ষর ব্যক্তি কখনোই মিথ্যা শেয়ার করেন না, বরং তথ্যের সত্যতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেন। এই দক্ষতা মানুষকে ভুয়া তথ্য, গুজব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিকর সংবাদ থেকে রক্ষা করতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, তরুণ সমাজ ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে তথ্য গ্রহণের আগেই যাচাইয়ের মানসিকতা তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতে সামাজিক ভারসাম্য বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তথ্য গ্রহণের আগে যাচাই, সত্য ও গুজবের পার্থক্য নিরূপণ এবং শেয়ারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হওয়া– এই অভ্যাসই পারে আমাদের এই নীরব সংকট থেকে রক্ষা করতে। আজ যে মিথ্যা অন্যকে আঘাত করছে, কাল সেটি ফিরেও আসতে পারে আমাদের দোরগোড়ায়। তাই সময় এসেছে অপতথ্যের মুখোমুখি হওয়া এবং তথ্যসাক্ষর নাগরিক গড়ে তোলার। তথ্যসাক্ষরতা এখন আর বিলাসিতা নয়। বরং একটি তথ্যসমৃদ্ধ, সচেতন, জ্ঞানভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের জন্যই তথ্যসাক্ষরতার বিকাশ এখন ভীষণ জরুরি।

শারীফ অনির্বাণ: শিক্ষক ও পিএইচডি গবেষক, ইজমির, তুরস্ক
[email protected]

আরও পড়ুন

×