ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ছাত্র সংসদ নির্বাচন

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন ডাকসুতে

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন ডাকসুতে
×

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অতীত ঘাটলেও বিভাজনের বয়ান ও রাজনৈতিক তৎপরতা উদোম হয়ে পড়ে

ইফতেখারুল ইসলাম 

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২১:০৫ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২১:০৭

মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের প্যানেল অভাবনীয় বিজয় অর্জন করেছে। মোট ২৮টি পদের মধ্যে ছাত্রশিবির প্যানেল জয়ী হয়েছে ২৩টি পদে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার প্যানেল হিসেবে এ বিজয় বহু দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতেও ডাকসুর এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।  

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) মাহমুদুর রহমান মান্না বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছেন, ‘ছাত্র আন্দোলন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। এ প্রজন্ম দুর্বৃত্তায়িত ও চাঁদাবাজ রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছে এবং পরিবর্তনের দাবি তুলছে।’ এরইমধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তার এই অভিবাদন নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক পালাবদলের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ারই ইঙ্গিত। 

হাল আমলে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি দ্বিমেরুকরণের পথে হেঁটেছে। বিভাজনের রাজনীতি সমাজে যেভাবে চাগিয়ে উঠেছে, তাতে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প খুঁজছিল। বিশেষত আওয়ামী লীগের পনের বছরের দুঃশাসন তরুণদের ওপর নির্ধারণীমূলক প্রভাব ফেলেছে। ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলও সেই বিভাজনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির-ই প্রতিফলন। 

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অতীত ঘাটলেও বিভাজনের বয়ান ও রাজনৈতিক তৎপরতা উদোম হয়ে পড়ে। যেমন– দীর্ঘ ২৯ বছর পর ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনেও শিক্ষার্থীরা পুরনো ধারার বাইরে গিয়ে ভিপি হিসেবে নুরুল হক নূরকে বেছে নিয়েছিল। এরপর আওয়ামী লীগ কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছিল যে, শিক্ষাঙ্গনে স্বচ্ছ নির্বাচন হলে ছাত্রলীগ জয়ী হয়ে আসতে পারবে না। ফলে তারা নির্বাচনী পথে না গিয়ে বরং শিক্ষার্থীদের দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল, যার ফল আরও ভয়াবহ হয়ে ফিরে আসে। 

এরশাদের পতনের পর ১৯৯০ এর দশক ‘গণতান্ত্রিক পথে উত্তরণ’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ১৯৯০ এর পর ২৯ বছর ডাকসুসহ অন্যান্য কেন্দ্রিয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখা হয়েছে। মূলত ছাত্র সংসদ বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক সত্তা গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। আর দীর্ঘদিন ধরে শিবিরের বিরুদ্ধে গুপ্ত রাজনীতির অভিযোগ ছিল, গণঅভ্যুত্থান সেই ট্যাগিংয়ের রাজনীতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ইতিমধ্যে এটা স্পষ্ট যে, আগামি দিনের রাজনীতি পুরনো ধারায় প্রবাহিত হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে শিবিরের অভাবনীয় বিজয় তাই প্রমাণ করে। তাছাড়া বিশ্বের নানা প্রান্তে তরুণদের নেতৃত্বে শ্রীলংকা, নেপাল, ফ্রান্সে বিদ্যমান ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে পুরনো শ্রেণিস্বার্থ ভেঙ্গে নতুন শ্রেণিস্বার্থ গড়ে উঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব, অপরিকল্পিত নগরায়নসহ নানাবিধ ব্যর্থতা জনগণকে পুরনো রাজনৈতিক দল থেকে বিমুখ করে তুলেছে। আর বৈশ্বিক নেতৃত্ব একমুখী ধারা থেকে বহুমুখী ধারায় প্রবাহিত হতে শুরু করেছে, এশিয়াসহ নানা অঞ্চলে মার্কিনবিরোধী জোট দানা বাঁধছে।  

মনে রাখতে হবে, গণঅভ্যুত্থান না হলে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্যানেল দেওয়ারই সুযোগই ছিল না। তাদের সুসংহত সাংগঠনিক তৎপরতার মধ্যদিয়ে এ ফলাফল পেয়েছে। হয়তো জাকসু, রাকসু, চাকসুসহ অন্যান্য নির্বাচনেও তারা এ ধরনের চমক দিতে যাচ্ছে। জাতীয় রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম হলেও সামাজিকভাবে সংহতি গড়ে তুলতে– বিশেষত শিক্ষার্থী– দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। অতীতের রাজনৈতিক বলয়ে সেটির ফলাফল পাওয়া কঠিন হলেও গণঅভ্যুত্থান অবারিত সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। মূলত রাজনীতিতে প্রধান রাজনৈতিক দলের বাইরে তৃতীয় কোনো পক্ষ গড়ে না উঠা পর্যন্ত– অন্তত এক দশকের বেশি সময়– গণঅভ্যুত্থানের ফল জামায়াত-শিবিরই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ভোগ করবে। 

দশকের পর দশক ধরে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বিভাজনের রাজনীতি করেছে। এতে বিশেষত তরুণসমাজ ও শিক্ষার্থীদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠনগুলি যে ধরণের নিপীড়নমূলক তৎপরতা চালিয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীরা বিকল্প বেছে নিতে চেয়েছে। তাই রাজনৈতিক দল কিংবা অঙ্গসংগঠনগুলির কর্মসূচি সমস্যার সমাধানমুখী না হয়ে স্রেফ ক্ষমতাদখলের চর্চার ধারাটি এবারে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই ফল নিঃসন্দেহে জাতীয় রাজনীতিতে  প্রভাব ফেলবে। এতে কেবল ক্ষমতার অদল-বদল ঘটবে না, বরং শ্রেণিস্বার্থে ব্যাপক আকারে পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected] 

আরও পড়ুন

×