ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জনস্বাস্থ্য

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের অদৃশ্য ফাঁক বন্ধ হোক

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের অদৃশ্য ফাঁক বন্ধ হোক
×

মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৭ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ৮০ লাখের বেশি মানুষ মারা যায় তামাকজনিত রোগে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব ভয়াবহ। ২০১৭ সালের গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ৬১ হাজার মানুষ মারা যায় (প্রতিদিন গড়ে ৪৪২ জন) এবং পঙ্গুত্বের শিকার হয় চার লাখ মানুষ। হৃদরোগ, ক্যান্সার ও শ্বাসতন্ত্রের নানান রোগের অন্যতম কারণ এই তামাক। মোটাদাগে, পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে প্রায় সাত কোটি ৬২ লাখ মানুষ এ শিল্পের ক্ষতির শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তামাক একমাত্র বৈধ ভোক্তা পণ্য, যা তামাক কোম্পানির উদ্দেশ্যমতো ব্যবহার করলে প্রায় অর্ধেক ভোক্তাকে হত্যা করে। এমনকি তামাক বাংলাদেশের অকালমৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ হিসেবেও চিহ্নিত।

এরই মধ্যে তামাক কোম্পানি নতুন নতুন প্রাণঘাতী পণ্য বাজারজাত করে তরুণদের আকৃষ্ট করে আজীবন গ্রাহকে পরিণত করার চেষ্টা চালায়। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের আর্টিকেল ৫.৩ তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ থেকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে সুরক্ষিত রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়। এই নির্দেশনা অনুসারে,  তামাক কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখা, স্বার্থসংঘাত এড়িয়ে চলা, অংশীদারিত্ব প্রত্যাখ্যান করা, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে সম্পূর্ণভাবে স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রাখা আবশ্যক।

বাংলাদেশ ২০০৩ সালে ডব্লিউএইচও এফসিটিসি-তে স্বাক্ষর করে এবং ২০০৮ সালে আর্টিকেল ৫.৩ অনুমোদন করে। সেখানেও বলা হয়েছে, তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি অবশ্যই তামাক কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। অথচ ২০২৫ সালে এসে দেশ ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। গত ১৩ জুলাই ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য (নিয়ন্ত্রণ) আইন সংশোধনের খসড়া পর্যালোচনার জন্য গঠিত উপদেষ্টা কমিটি ঘোষণা করেছে যে তারা তামাক কোম্পানির প্রতিনিধিদের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের ‘স্টেকহোল্ডার আলোচনায়’ আমন্ত্রণ জানাবে। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, সরকার এখনও তামাক নিয়ন্ত্রণকে রাজস্ব আয়ের চশমা দিয়ে দেখছে। এটি কেবল গুরুতর নৈতিক ও আইনি উদ্বেগই তৈরি করছে না, বরং এফসিটিসি আর্টিকেল ৫.৩-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে তামাক কোম্পানির মৌলিক দ্বন্দ্বকে উপেক্ষা করার শামিল।

বাংলাদেশে বহু আগেই প্রমাণিত হয়েছে যে তামাক কোম্পানির অর্থনীতিতে অবদানের দাবিগুলো অতিরঞ্জিত। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির তথ্য উল্লেখ করে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি টু ফাইট টোব্যাকো জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কেবল তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুর অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা তখনকার জিডিপির প্রায় ১.৪ শতাংশের সমান এবং সেই বছরের তামাক থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের চশমা দিয়ে দেখলেও তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুর অর্থনৈতিক ক্ষতি তামাক থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব এর চেয়ে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা বেশি। তা ছাড়াও তামাক কোম্পানি দাবি করে যে এক লাখ ৫০ হাজার কৃষক তামাক চাষে যুক্ত, বাস্তবে তা দেশের মোট এক কোটি ছয় লাখ ৫৬ হাজার কৃষকের ১ শতাংশও না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বহু আগে থেকেই এসব কৃষককে বিকল্প ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করছে। 

তামাক ১৪ শতাংশ খুচরা কর্মসংস্থানের জোগান দেয়– এই দাবিও ভ্রান্ত। চায়ের দোকান এবং ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোর অধিকাংশ আয় অন্যান্য পণ্য থেকে আসে। ২০১৯ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে কার্যকর ১৯৮টি বিড়ি কারখানায় মোট ফুলটাইম কর্মী ছিল মাত্র ৪৬ হাজার ৯১৬ জন। 

২০২৪ সালে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে, নাগরিক সমাজের সহায়তায় ডব্লিউএইচও এফসিটিসির আলোকে যে খসড়া সংশোধনী প্রস্তাব করেছে, তা আমাদের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে আরও শক্তিশালী করার দিকে বড় পদক্ষেপ। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অধূমপায়ীদের সুরক্ষার জন্য সব ধরনের পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বিলুপ্ত করা, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকপণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা, তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা প্রভৃতি। এসব প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে তামাক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তামাক কোম্পানির সঙ্গে আলোচনার নামে এ প্রক্রিয়াকে দুর্বল করা ঠিক হবে না। এটি কেবল আইন লঙ্ঘন নয়, আমাদের জাতীয় বিবেকেরও পরাজয়।

মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ এনডিসি: সাবেক সচিব; সদস্য,
জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন
 

আরও পড়ুন

×