ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গ্রামীণ নারী দিবস

অধিকার নেই, তবুও অগ্রণী 

অধিকার নেই, তবুও অগ্রণী 
×

সানজিদা খান রিপা

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৬ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাস কয়েক আগে বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের এক ভূমিহীন নারী আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার নিজের জমি নেই। স্বামীর নামে যা আছে, তাতেও আমার অধিকার নেই। প্রতিদিন ফসলের জন্য মাঠে কাজ করি, কিন্তু সেই জমির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমার পরিশ্রমের ফলও আমার নয়।’ এ অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর একার নয়; দেশের লাখো গ্রামীণ নারীর বাস্তবতার প্রতিফলন। খাদ্য উৎপাদনে অর্ধেকের বেশি কাজ করলেও জমি ও সম্পদে নারীর অধিকার নেই বললেই চলে। তাদের হাতে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নেই এবং সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো তাদের নেতৃত্বের পথেও বাধা সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫০.৫ শতাংশ নারী; শহরের তুলনায় গ্রামে আরও বেশি। গ্রামীণ জনসংখ্যার ৫০-৫৫ শতাংশ নারী। কৃষি শ্রমিকের ৫৮ শতাংশ নারী হলেও মাত্র ৪ শতাংশ নারী ভূমির মালিক। খাসজমি বিতরণে বিধবা, একক বা আদিবাসী নারীর অন্তর্ভুক্তি সীমিত। আর স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক জটিলতা তাদের অধিকার কার্যকর হতে বাধা দেয়। জমি ও সম্পদের অনুপস্থিতি তাদের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমাবদ্ধ রাখে। ফসল বা মাছের ক্ষতি হলে বিকল্প চাষের সুযোগ নেই; ইউনিয়ন পর্যায়ে নেতৃত্বের অভাব তাদের স্থানীয় জলবায়ু তহবিল, ক্ষতি মোকাবিলা প্রকল্প বা কৃষি সহায়তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকে সীমিত রাখে। 

গ্রামীণ নারীরা খরাপ্রতিরোধী বীজ ব্যবহার, জৈব সার প্রয়োগ, পানি সংরক্ষণ, সম্প্রদায়ভিত্তিক বনায়নসহ অভিযোজনমূলক কৃষিচর্চায় সক্রিয়। কিন্তু ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ের জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে তাদের সংখ্যা অত্যন্ত কম এবং যা কিছু উপস্থিতি আছে, তা প্রায়ই আলংকারিক। প্রকল্প সভা বা মাঠ পর্যায়ের আলোচনায় নারীরা বসে থাকেন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাদের বলা হয় না বা তারা কথা বলতে পারেন না। প্রকল্পের বাস্তব নেতৃত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুরুষপ্রধান কাঠামোর মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়। ফলে নারীর অংশগ্রহণ শুধু প্রদর্শনীর মতো সীমিত থাকে।

চা বাগান, কৃষি এবং মৎস্য খাতেও একই বৈষম্য চোখে পড়ে। নারী শ্রমিক পুরুষদের তুলনায় ২০ থেকে ৫৬ শতাংশ কম মজুরি পান। সরকারি প্রকল্প, ক্রেডিট সুবিধা এবং জেলে কার্ডেও তাদের প্রবেশ সীমিত। স্বাস্থ্যঝুঁকি, চরম পরিশ্রম এবং সামাজিক বাধা নারীর উদ্যোগ ও নেতৃত্ব প্রদানের সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করে।

গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পরও গ্রামীণ নারীর জন্য আশানুরূপ পরিবর্তন দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত প্রথম বাজেটেও গ্রামীণ নারীদের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। ফলে নীতি, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের অভাবে গ্রামীণ নারীর ভূমি অধিকার, আর্থিক স্বাধীনতা এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত থেকে গেছে। যদিও নারীরা থেমে থাকেননি।

নারী শুধু খাদ্য উৎপাদন নয়; জলবায়ু অভিযোজন, কমিউনিটি নেতৃত্ব এবং স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায়ও অগ্রণী। স্থানীয় জলাধার, নৌকা ও সেচ ব্যবস্থাপনায় তারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সম্প্রদায়ভিত্তিক বনায়ন ও খরা প্রতিরোধী কৃষি প্রয়োগে সক্রিয়।

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে গ্রামীণ নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী এবং গ্রামীণ নারী তাদের সমাজ ও খাদ্য নিরাপত্তার মূল শক্তি। নির্বাচনী প্রার্থীদের জন্য এটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব– তাদের ইশতেহারে গ্রামীণ নারীর ভূমি অধিকার, আর্থিক স্বাধীনতা, মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ এবং জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে নেতৃত্বের সুযোগ নিশ্চিতকরণের প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। বৈষম্যহীন ও অংশগ্রহণমূলক সমাজ গঠনে গ্রামীণ নারীর স্বীকৃতি, অধিকার ও নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস ২০২৫ স্মরণ করিয়ে দেয়– নারীর শ্রম, দক্ষতা ও নেতৃত্ব ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারক, প্রশাসন এবং সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে নারীর অবদান, অধিকার এবং নেতৃত্ব নিশ্চিত এবং আগামীর বাংলাদেশ বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হয়।

লেখক: উন্নয়নকর্মী

আরও পড়ুন

×