ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তৃতীয় মেরু

নির্বাচনের আগেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু সম্ভব?

নির্বাচনের আগেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু সম্ভব?
×

শেখ রোকন

শেখ রোকন

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৭ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ২২:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় ‘স্তব্ধ রংপুর’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’। কর্মসূচি অনুযায়ী ৩০ অক্টোবর রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ যে যেখানে থাকবে, বেলা ১১টায় কাজ বন্ধ রেখে ১৫ মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে (বাসস, ২৪ অক্টোবর ২০২৫)। 

বাংলাদেশ-ভারত অভিন্ন নদী তিস্তায় ন্যায্য হিস্যার দাবিতে রিভারাইন পিপল, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন প্রভৃতি পরিবেশবাদী সংগঠনের তৎপরতা নতুন নয়। গত দেড় দশকে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাসদ, সিপিবির মতো রাজনৈতিক দল লং মার্চও করেছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি সামনে আসার পর এসব আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মূলত বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ যেভাবে রংপুরের সর্বজনীন কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে, সেটি আগে দেখা যায়নি। চলতি বছরের ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় তিস্তার তীরে ১১টি পয়েন্টে অবস্থান কর্মসূচি ছিল দারুণভাবে সফল। ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় তিস্তার উভয় তীরে একযোগে মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচির নতুনত্বও সামাজিক মাধ্যমে ঢেউ তুলেছিল। তৃতীয় পর্যায়ে আসছে ‘স্তব্ধ রংপুর’ কর্মসূচি।

তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বাসসকে বলেছেন, ‘সরকার যদি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে আগামী নভেম্বর মাসে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু না করে, তবে তিস্তাপাড়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। অচল করে দেওয়া হবে গোটা উত্তর অঞ্চল।’

প্রশ্ন হচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই কি তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে? তপশিল ঘোষণার আগে তো দূর কি বাত! মনে রাখতে হবে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীনের সঙ্গে  ‘আনুষ্ঠানিক’ আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রকৌশল কোম্পানি ‘পাওয়ার চায়না’ ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা চূড়ান্ত করেছিল। ওই বছর এপ্রিল মাসে ‘চায়না মিনশেং ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড’ প্রকল্পটিতে অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ‘লেটার অব ইন্টারেস্ট’ পাঠায়। পাওয়ার চায়নার সমীক্ষা এবং চায়না মিনশেংয়ের অর্থায়নের আগ্রহের ভিত্তিতে ২০১৯ সালের মে মাসেই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘তিস্তা রিভার কম্প্রিহেন্সিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ (টিআরসিএমআরপি) শীর্ষক প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) প্রস্তুত করে। ২০২০ সালের জুলাই মাসে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ৯৮৩.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্পটির জন্য ‘চীনা অর্থায়নের প্রস্তাব’ সংক্রান্ত চিঠি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠানো হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল।

বলা বাহুল্য, গত পাঁচ বছরে তিস্তা দিয়ে তিরতির করে অনেক পানি বয়ে গেছে। মহাপরিকল্পনাটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের ভূ-রাজনৈতিক খেলাও কম দেখা যায়নি। বিশেষত, যে আওয়ামী লীগ সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে জীবনানন্দ দাশের সুবিনয় মুস্তফীর মতো ‘একসাথে বিড়াল ও বিড়ালের মুখে-ধরা-ইঁদুর’ হাসাতে চেয়েছিল, ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে তাদের পতন ঘটে। 

তিস্তা মহাপরিকল্পনার নীতিগত, কারিগরি, প্রতিবেশগত ও ভূরাজনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন মাধ্যমে বিস্তারিত লিখেছি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল ছিল যে, তিস্তা মহাপরিকল্পনার পরিস্থিতি কী দাঁড়াচ্ছে। এর একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে চলতি বছরেই শুধু সমকালে প্রকাশিত আমার তিনটি নিবন্ধ থেকে–‘নতুন’ তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে পুরাতন পর্যবেক্ষণ (১৯ জানুয়ারি ২০২৫), তিস্তা নিয়ে বিএনপি আরও যা করতে পারে (২ মার্চ ২০২৫), চীন সফরের ‘তিস্তা প্লাস’ তাৎপর্য (৩০ মার্চ ২০২৫)। 

মনে আছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকদের একজনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কী হচ্ছে? তিনি বলেছিলেন, তখনও আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা শুরু হয়নি; তারা ‘পরিস্থিতি বিশ্লেষণ’ করছেন। কয়েক সপ্তাহ পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার রংপুর সফরে গিয়ে বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে (প্রথম আলো, ৩০ নভেম্বর ২০২৪)।

তারপর চলতি বছর ২৮ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরে ‘চীনের পুনঃপ্রবেশ’ নিশ্চিত করে যৌথ ঘোষণার ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল– ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীনা কোম্পানির অংশগ্রহণকে বাংলাদেশ পক্ষ স্বাগত জানায়।’

স্মর্তব্য, গত বছর ৮ থেকে ১০ জুলাই বেইজিং সফর থেকে ফিরে ১৪ জুলাই গণভবনের ‘ভাগ্যনির্ধারণী’ সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘চীন তো রেডি! কিন্তু আমি চাচ্ছি যে, এটি ইন্ডিয়া করে দিক। তাহলে এই প্রজেক্টের জন্য যা দরকার, ইন্ডিয়া দিতে থাকবে। ঠিক আছে? সাফ সাফ কথা, রাখঢাক নাই!’

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আগস্ট মাসে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সমকালকে বলেছিলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। আমরা মহাপরিকল্পনার আলোকে একটি প্রকল্প চূড়ান্ত করেছি। সেই প্রকল্পটি জনগণের সামনে নিয়ে গেছি। জনগণ মতামত দিয়েছে। তার ভিত্তিতে তিস্তা নদীটাকে পুনরুদ্ধার করা হবে। আমাদের পক্ষ থেকে এই প্রকল্প চূড়ান্ত করে চীন সরকারকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হয়তো আগামী সপ্তাহে চলে যাবে। আমরা আশা করি, ২০২৬ সালের পয়লা জানুয়ারি আমরা তিস্তা প্রকল্পের কাজটা শুরু করে দিতে পারবো’ (১০ আগস্ট ২০২৫)।

তাহলে, তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের দাবিমতো, তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করতে অসুবিধা কী? বিশেষত, সাম্প্রতিক এক খবরে বলা হয়েছে, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের কাছে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা (ঋণ) চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, এ বছরের মধ্যেই আর্থিক চুক্তি (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট) সই করতে পারে দুই দেশ’ (প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট ২০২৫)। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘তিস্তা প্রকল্পে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চায়।’

ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আমার ধারণা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ নির্বাচনের আগে শুরু হবে না। আর কিছু না হোক, নিছক প্রক্রিয়াগত কারণেই। এই নিবন্ধ লেখার আগে নীতিনির্ধারকদের একজনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, নির্বাচনের আগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুরু করা যাবে কিনা? তাঁর বক্তব্য, চীনের বিশেষজ্ঞ দল এখন সম্ভাব্যতা যাচাই 

প্রতিবেদনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। সেটি ইতিবাচক হলে অর্থায়নের আলোচনা আসবে। অর্থায়নের আলোচনা চূড়ান্ত হলে নকশার প্রশ্নটি আসবে। তারপর মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন কাজ শুরুর প্রশ্ন।

বিভিন্ন সূত্রে আমি যতদূর বুঝেছি, এক কথায় বললে, অন্তর্বর্তী সরকার এবং রংপুরবাসীর সদিচ্ছা ও অধীর আগ্রহ সত্ত্বেও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বল এখন চীনের কোর্টে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের কাছে বলটি ফেরত দিতে চাইছে। মাঠ পর্যায়ের নেতারা যাই বলুন, আগামী নির্বাচনে ক্ষমতার দৌড়ে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোও নিশ্চয়ই মাত্র কয়েক মাসের অপেক্ষার বিনিময়ে এই মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সুযোগ ছাড়তে চাইবে না। উপরন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও মহাপরিকল্পনা-সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়ে থাকতে পারে।

শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×