ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

‘লকডাউন’ কর্মসূচির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা

‘লকডাউন’ কর্মসূচির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা
×

খুশী কবির

খুশী কবির

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২০ | আপডেট: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জু   লাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও দলটির ‘লকডাউন’ কর্মসূচি যেভাবে ‘পালিত’ হলো, সেটা বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। দলটির শীর্ষ সারির প্রায় সব নেতা যদিও দেশের বাইরে কিংবা কারাগারে অবস্থান করছেন, কর্মসূচিটি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার তুঙ্গে ছিল। আর আতঙ্ক বা সমর্থন; যে কারণেই হোক, এটা সত্য, বৃহস্পতিবার জনবহুল ও যানজটপূর্ণ রাজধানী ঢাকা ছিল কার্যত ফাঁকা।

বৃহস্পতিবার অফিস-আদালত যদিও স্বাভাবিকভাবে চলেছে, সাধারণ নাগরিকরা প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের মধ্যেও এক ধরনের উৎকণ্ঠা ছিল। সে কারণে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সব মিলিয়ে ‘লকডাউন’ কতটা কার্যকর হলো, জানি না। কিন্তু কোথাও সংঘর্ষের ঘটনা দেখা যায়নি, সেটা এক দিক থেকে স্বস্তির বলা যায়। 

আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হলেও সেটার সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নিয়ে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন আগে থেকেই বাস-ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেলের বিস্ফোরণও দেখেছি। যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এ ধরনের নাশকতামূলক পদক্ষেপ দেখা গেলেও এসব কারা ঘটায়, সেটা কখনও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয় না। বিশেষত বাসসহ বিভিন্ন পরিবহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনার ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ অতীতে দেখা গেছে। এবারের ঘটনাগুলো কারা ঘটিয়েছে, সেটা অতীতের মতোই অমীমাংসিত। ১২ নভেম্বর সমকালেই প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখলাম, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি পরস্পরকে সন্দেহ করছে।

ওদিকে, সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছিল। বিভিন্ন এলাকা ও সড়কে তল্লাশি চালানো হয়েছে। অতীতেও বিরোধী দলের কর্মসূচি সামনে রেখে সরকার এ ধরনের পদক্ষেপ নিত। বিশেষত গণঅভ্যুত্থানের আগের কয়েক বছর বিরোধীদলীয় কর্মসূচির আগে ঢাকাগামী মানুষজনের মোবাইল ফোন যেভাবে তল্লাশি করা হতো, সেটা স্পষ্টতই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। হতাশার বিষয়, এবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের কর্মী সন্দেহে নাগরিকদের মোবাইল ফোন তল্লাশি করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, গণঅভ্যুত্থানের পর কী পরিবর্তন হলো? পুলিশ আগের মতোই নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে কেন?

আওয়ামী লীগ শাসনামলে আমরা দেখতাম, বিরোধী দলের কর্মসূচি চলাকালে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী পাড়া বা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ‘মোতায়েন’ থাকত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি। এবারও একই ঘটনা দেখা গেছে। সরকার যেহেতু অরাজনৈতিক; বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির কর্মীদের এই ভূমিকায় দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ‘সন্দেহভাজন’ আওয়ামী লীগ কর্মীকে ধরে হেনস্তা, মারধর ও পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়ক থেকে একজন বিদ্যালয়গামী কিশোরকে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে সেখানে উপস্থিতির ‘অপরাধে’ যেভাবে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটা অতীতের ঘটনাগুলোকেই মনে করিয়ে দেয়। পরে অবশ্য তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।   

এটা স্পষ্ট– জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এত প্রাণ ও আত্মত্যাগের পরও যদি আমরা অতীতের অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারি, তাহলে কখন বের হবো?
এটাও স্পষ্ট, ক্ষমতাচ্যুত ও দৃশ্যত রাজনীতির মাঠছাড়া আওয়ামী লীগ এ ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করে আওয়াজ দিতে চাইছে– তারা সক্রিয় ও শক্তিশালী আছে। যদিও তাদের নেতারা গা বাঁচাতে ব্যস্ত। গ্রামগঞ্জে কোথাও সে অর্থে তাদের তৎপরতা আমরা দেখছি না। কিন্তু দলটিকে মনে রাখতে হবে, জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতি মানুষ আর নিতে চাইবে না। যেসব কর্মসূচিতে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয় সেগুলো মানুষ ইতিবাচকভাবে নেয় না। এ দেশে আওয়ামী লীগের সমর্থকগোষ্ঠী আছে; দলটির সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যও আছে। রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে তারা আরও নানা ইতিবাচক কর্মসূচি নিতে পারে। যদিও আগেই বলেছি, কারা বাস-ট্রেনে আগুন দিয়েছে– স্পষ্ট নয়। অনেকে সময় পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েও ভিন্ন কোনো গোষ্ঠী নাশকতা করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুযোগ নিতে পারে।

গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকেও বিষয়টি মনে রাখতে হবে। আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল বিরোধী দলের ওপর জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে। মানবাধিকার, সভা-সমাবেশের অধিকার, সমালোচনা করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলেই সর্বস্তরের মানুষ গণঅভ্যুত্থানে যোগ দিয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায়িত রাজনৈতিক দলগুলো যদি একইভাবে জবরদস্তিমূলক অবস্থান নেয়, সেটা আখেরে কারও জন্যই ভালো হবে না।

আমি মনে করি, এখানেই অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ। সরকারের তরফে যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে, তেমনই কোনো নাগরিক যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ দুর্বৃত্তরা যেন না পায়, সে বিষয়ও নিশ্চিত করা জরুরি। 
স্বাভাবিক রাজনৈতিক অস্থিরতাকালের চেয়েও বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাতি একটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য অধীর অপেক্ষায়। গত তিনটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। অনেক আন্দোলন ও ত্যাগের বিনিময়ে আসা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অর্ন্তভুক্তিমূলক নির্বাচনের সুযোগটি হারানো যাবে না। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে এমন কার্যক্রম সত্যিকার গণতান্ত্রিক পরিসর এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে না।
আগামী নির্বাচনটি যাতে ভালোভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে সে জন্য বর্তমানে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব বেশি। নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও তার কর্মী-সমর্থকদের নাগরিক অধিকার নিষিদ্ধ হয়নি। সেই অধিকার রক্ষায় বর্তমানে ক্রিয়াশীল যে রাজনৈতিক দল এগিয়ে আসবে, ভোটের বাজারে তাদের বাড়তি সুবিধা না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। 

নির্বাচন কমিশনও যাতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিতে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। মানুষ একটি সুন্দর নির্বাচন দেখার অপেক্ষায়। আমার ধারণা, নেতারা যা-ই বলুন; আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকরাও একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেখার অপেক্ষায়। মানুষের এ আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং গণতন্ত্রের পথে মসৃণ যাত্রার জন্য নির্বাচনই প্রধান মাধ্যম। সরকার, ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ; সবার দায়িত্ব সেই নির্বাচন সুন্দর ও সার্থক করে তোলা। আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন ছাড়া সেটা কীভাবে সম্ভব? ১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে পক্ষে-বিপক্ষে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে যা ঘটল, সেটা দেখে আশাবাদী হওয়া কঠিন।

খুশী কবির: মানবাধিকারকর্মী; 
সমন্বয়ক, নিজেরা করি

আরও পড়ুন

×