যে ইমরান খানকে আমি চিনি
শশী থারুর
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দুর্দান্ত একজন ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইমরান খান এক সময় পাকিস্তানের সংস্কার ও দেশটিকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। গুজব রয়েছে যে, তিনি রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে মারা গেছেন, যেখানে তিনি ২০২৩ সাল থেকে বন্দি রয়েছেন। তাঁর ছেলে কাসিম খান পিতার বেঁচে থাকার প্রমাণ চেয়ে তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। ইমরান খানের বয়স ৭২। তাঁর মৃত্যু যদি হয়ে থাকে, তাহলে তা বিশ্ববরেণ্য এক জাতীয় নেতৃত্বের রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে এক করুণ পরিণতি বরণের কথা তুলে ধরবে।
ইমরান খান ১৯৫২ সালে লাহোরে একটি সম্ভ্রান্ত পশতুন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ক্রিকেটের অন্যতম প্রতিভাবান এ অলরাউন্ডার আইচিসন কলেজ, রয়্যাল গ্রামার স্কুল ওরচেস্টার এবং অক্সফোর্ডের কেবল কলেজে পড়াশোনা করেন। তাঁর মধ্যে ক্রীড়াক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভার সমন্বয় ঘটেছে। ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি নিবিষ্টচিত্তে ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করেন এবং ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে তা শেষ হয়। এটি এমন এক মুহূর্ত, যা তাঁকে স্থায়ীভাবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে জায়গা করে দেয়। অধিনায়ক হিসেবে তিনি নিজের কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা, তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও অভ্যন্তরীণ বিভাজিত একটি দলকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতার জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন।
এক নাটকীয় মোড়
তাঁর জীবনের দ্বিতীয়ার্ধ কেটেছে রাজনীতিকে ঘিরে। ১৯৯৬ সালে তিনি পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রতিষ্ঠা করেন, যে দলটি বছরের পর বছর প্রান্তিক পর্যায়ে লড়াই করে ২০১০ সালে সাফল্য অর্জন করে। তাঁর বার্তা ছিল দুর্নীতিবিরোধী, জাতীয় মর্যাদা এবং ইসলামী কল্যাণ, যা পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি ও সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে হতাশ একটি প্রজন্মের কাছে আগ্রহ জাগিয়েছিল। ২০১৮ সালে তিনি ‘নয়া পাকিস্তান’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। তবে, তাঁর মেয়াদ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, কূটনৈতিক বাধা এবং পাকিস্তানের সামরিক এস্টাব্লিশমেন্টের চিরস্থায়ী ছায়া তথা ‘ডিপ স্টেট’ দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর পতন ঘটায়।
পরবর্তী বছরগুলোতে একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটার হিসেবে ভারত দর্শনে এলে তাঁর সঙ্গে আমার আরও বেশি দেখা হতো। আমি যেখানে যেতাম সেখানে তিনি সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন এবং আমরা প্রায়ই ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে একই সংবাদধর্মী অনুষ্ঠানে উৎসুক বাক্যবিনিময়ে লিপ্ত হতাম। তিনি স্পষ্টবাদী, মানুষকে জাগিয়ে দিতে পারতেন এবং ক্রিকেট, রাজনীতি বা ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করতে সর্বদা আগ্রহী ছিলেন। আমাদের দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সত্ত্বেও তিনি ভারতে, বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং তাঁর ক্রীড়া ঐতিহ্য ও স্নেহশীলতার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন।
ঘণ্টাব্যাপী আলাপ
কিন্তু ইমরানের সঙ্গে আমার সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ছিল ২০১৭ সালে, যখন আমি একটি ভারতীয় সংসদীয় প্রতিনিধি দল নিয়ে ইসলামাবাদে এশিয়ান সংসদ সদস্যদের সম্মেলনে যোগদান করেছিলাম। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ইমরান আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। নিরাপত্তার কারণে পাকিস্তান সরকার আমাকে হোটেল থেকে বের হতে দেয়নি। দমে না গিয়ে ইমরান স্বেচ্ছায় আমার কাছে আসতে রাজি হন। তিনি অর্ধডজন সহযোগী নিয়ে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় আমি দুই বিজেপি সহকর্মী স্বপন দাশগুপ্ত ও মীনাক্ষী লেখিকে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাই, যাতে এই ধরনের বৈঠক আয়োজনে আমার পক্ষ থেকে কোনো অসংগতি না থাকে।
দ্বন্দ্বভিত্তিক গবেষণা
সেনাবাহিনীর সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে প্রাপ্ত ইমরানের প্রধানমন্ত্রিত্ব ছিল দ্বন্দ্বমূলক এক গবেষণার বিষয়। তিনি ভারতের সঙ্গে শান্তি চেয়েছিলেন, কিন্তু সামরিক বাহিনীর কৌশলগত কারণের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। গত কয়েক বছর ধরে ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন ইমরান খান। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন ইমরান খান। অনেক পাকিস্তানির কাছেই তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাঁর বোনেরা আদিয়ালা কারাগারের বাইরে প্রতিবাদ করেছিলেন, যাদের ওপর পুলিশি হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা তাঁর প্রভাব মুছে ফেলার জন্য রাষ্ট্রের দৃঢ় সংকল্পের একটি প্রতিফলন।
শশী থারুর ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমানে দেশটির কংগ্রেস দলের এমপি; এনডিটিভি থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- শশী থারুর
