নারী অধিকার
পাঁচ কর্মঘণ্টার প্রস্তাব সুবিধা না নীরব নিয়ন্ত্রণ?
ফারহানা হাফিজ ও সাবিনা পারভীন
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, তারা ক্ষমতায় এলে নারী কর্মীদের দৈনিক কর্মঘণ্টা পাঁচে নামিয়ে আনবেন। তাঁর এ প্রস্তাবনাকে বিচ্ছিন্নভাবে নারীর সুবিধা-অসুবিধার প্রশ্ন হিসেবে দেখা বিভ্রান্তিকর। এটি শ্রমনীতির প্রশ্নমাত্র নয়; পেছনে রয়েছে জেন্ডার-রাজনীতি, মতাদর্শ, ক্ষমতা এবং ভোট ব্যাংকনির্ভর কৌশলের জটিল সমন্বয়। এটি আসলে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক কৌশল, যেখানে নারীর ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। বিশেষত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো পদ্ধতিগতভাবেই নারী ভোটারদের নিশানা করে থাকে। নারীর স্বাভাবিক স্বাধীনতা, চলাফেরা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থনৈতিক ভূমিকা সীমিত করার বার্তা তাদের কার্যক্রম ও কর্মসূচিতে আগেও দেখা গেছে। কর্মঘণ্টা কমানোর ‘প্রস্তাব’ সেই বৃহত্তর মতাদর্শিক প্রকল্পের অংশ হতে পারে। এর উদ্দেশ্য নারীর কাছে স্বস্তির বার্তার মোড়কে সমর্থন অর্জন করা। প্রকৃতপক্ষে এটা নারীর জীবনকে ‘সহজ’ করার নামে ক্ষমতা কমিয়ে আনবে। প্রকৃত ফল হবে নারীর শ্রম, আয়, নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়নের সংকোচন।
পাঁচ ঘণ্টা কাজের প্রস্তাব অনেক নারীর কাছে স্বস্তিদায়ক মনে হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের নারীরা দ্বৈত দায়িত্বে ন্যুব্জ– প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত শ্রমের পাশাপাশি ঘরের অবৈতনিক কাজের প্রায় সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাদের। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পরিসংখ্যানে বারবার প্রমাণিত– নারীরা দিনে পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ সময় ব্যয় করেন পরিবারের যত্নশীলতার কাজে। সন্তান, বৃদ্ধ, অসুস্থ সদস্যদের দেখাশোনা, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা– সবই সমাজভিত্তিক কাঠামোতে ‘নারীর কাজ’ হিসেবে স্থির হয়ে আছে। ফলে অনেক নারীর মনে হতে পারে, কর্মঘণ্টা কমায় চাপ কিছুটা কমবে।
বাস্তবে ধারণার গভীরে গেলে বোঝা যায়, এটি নারীর ওপর চাপ কমানো নয়, বরং ক্ষমতা কমানোর রাজনৈতিক ছক। কারণ কর্মঘণ্টা কমানোর প্রথম প্রভাব পড়বে নারীর আয়ে। কম সময়ে কম কাজ মানে কম উপার্জন। কম উপার্জন মানে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে ধীরে ধীরে সরে পড়া। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলে নারী ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান হারাবে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি নারীর নেতৃত্বের পথে বাধা সৃষ্টি করবে। পূর্ণকালীন কাজের বাইরে থাকা বা অল্প সময়ের কর্মী হিসেবে চিহ্নিত হলে প্রতিষ্ঠানগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা পদোন্নতিতে নারীদের সমানভাবে বিবেচনা করে না। ফলে এই ‘স্বস্তি’ আসলে নারীদের শ্রমবাজারে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেবে।
পাঁচ ঘণ্টা কাজ করিয়ে সমান বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত কাগজে সুন্দর শোনালেও বাস্তবে এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। আমাদের দেশে সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত চাকরির বাইরে অধিকাংশই উৎপাদনমূলক বেসরকারি খাত। এর মূল উদ্দেশ্যই মুনাফা। নারীর জন্য পাঁচ ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে আট ঘণ্টার সমপরিমাণ মজুরি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই মানবে না। কারণ এতে তার মুনাফা কমে যাবে। ফলে তারা নারী শ্রমিক নিয়োগ কমিয়ে বা বন্ধ করে দেওয়ার ‘সহজ’ পথই বেছে নেবে। এর ফলে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ আরও কমার ঝুঁকিতে পড়বে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব অনুযায়ী ইতোমধ্যে দেশের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ৩৭ শতাংশ, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এমন প্রস্তাব নারীদের কাজ করার সময়, সুযোগ ও স্থায়িত্ব কমাতে পারে; প্রতিষ্ঠান বা অর্থনীতিতে নারীর গড় অংশগ্রহণ আরও সংকুচিত করতে পারে। ফলস্বরূপ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৫ এর ‘লিঙ্গ সমতা ও নারী-ক্ষমতায়ন’ অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শ দ্বারা পরিচালিত অনেক পুরুষও এ প্রস্তাবকে ‘ন্যায্য’ বলে ভাবতে পারেন। বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে নারী। শিক্ষা, কাজ ও প্রশিক্ষণে নেই, বাংলাদেশে এমন জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের বেশি নারী। তাদের অর্থনীতিতে যুক্ত করতে হলে যেখানে শিশু-যত্নসহ অন্যান্য সেবা ব্যবস্থা আরও বাড়ানো দরকার, সেখানে কর্মসময় পাঁচ ঘণ্টা করার নেতিবাচক রাজনৈতিক ধারণা বা প্রস্তাব নারীদের আরও বাইরে ঠেলে দেবে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় শ্রমজীবী পরিবারের দুজন কাজ না করলে সংসার চালানো কঠিন। নারীর আয়ের পথ কমে গেলে দারিদ্র্য আরও বাড়বে; শ্রমজীবী পরিবার আরও বিপদে পড়বে। তাই এ ধরনের প্রস্তাব আসলে অর্থনীতি ও জেন্ডার বৈষম্যের কাঠামোকে যে আরও শক্তিশালী করবে, তা বিবেচনা জরুরি।
বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, আরও গভীরে। এটি নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত করার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রক্ষণশীল রাজনীতির ইতিহাস দেখলে স্পষ্ট হয়, নারীর চলাফেরা, পোশাক, শিক্ষা, শ্রম, জনপরিসরে উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কখনোই বিচ্ছিন্ন নয়। এটি বৃহত্তর মতাদর্শিক কাঠামোর অংশ, যেখানে ‘নারী ঘরে থাকবে, পুরুষ বাইরে কাজ করবে’– এই ধারণাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়। এভাবে নারীর শ্রমকে ‘অতিরিক্ত’ এবং পুরুষের শ্রমকে ‘মানদণ্ড’ বানিয়ে ফেলা একটি রাজনৈতিক কৌশল। রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘প্যাটারনালিস্টিক পপুলিজম’, যেখানে নারীদের স্বস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা হয়; প্রকৃত উদ্দেশ্য থাকে নারীর স্বাধীনতা সীমিত রাখা।
ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের লক্ষ্যই নারীর জনপরিসরে সক্রিয়তা কমানো। তারা জানে, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শিক্ষা ও নেতৃত্ব যত বাড়বে ততই রক্ষণশীল রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হবে। তাই নারীর কর্মঘণ্টা কমানোর মতো প্রস্তাব তাদের কাছে রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। এটি নারীদের ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করার এক ধরনের নীরব কৌশল।
চ্যালেঞ্জ হলো, অনেক নারীই এ কৌশলের রাজনৈতিক মাত্রা বোঝেন না। তাদের কাছে বিষয়টি ‘সহজ সুবিধা’। এ জন্যই নারী অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলোর জরুরি দায়িত্ব নারীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে, তাদের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামকে সম্মান করে যুক্তিগ্রাহ্য ও সহানুভূতিশীল ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ তৈরি করা। নারীদের বলা জরুরি যে, তাদের ক্লান্তি, চাপ, দায়িত্ব– সবই সত্য ও স্বীকৃত। কিন্তু এর সমাধান সময় কমানো নয়, বরং সাপোর্ট সিস্টেম উন্নত করা।
ইতিহাস বলছে, সময় কমলে কাজ কমে না; বরং ঘরের কাজ আরও বেড়ে যায়। কারণ পরিবার ধরে নেয় ‘তার হাতে সময় আছে’। তাই নারীর আসল দাবি হওয়া উচিত, ‘আমাকে কম সময়ের কাজ নয়, সমান সময়ের নিরাপত্তা, সম্মান ও সাপোর্ট দিন।’ নারীবাদী সংগঠনগুলোকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে– সময় কমানো মানে নারীর ওপর ঘরের দায়িত্ব আরও বাড়ানো। বরং নিরাপদ পরিবহন, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, ডে-কেয়ার, নমনীয় সময়সূচি, সমান মজুরি; সর্বোপরি ঘরের কাজে পুরুষের সমঅংশগ্রহণ রাজনৈতিক প্রস্তাব ও দাবি হওয়া উচিত।
এই মুহূর্তে নারী অধিকার সংগঠনগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হলো নারীদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সংঘবদ্ধ করা। স্বস্তিদায়ক প্রতিশ্রুতির আড়ালে কী ধরনের কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ লুকিয়ে আছে, ব্যাখ্যা করা। বোঝানো প্রয়োজন, উন্নত বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন কম সময় কাজ করে নয়; তা এসেছে নিরাপদ, ন্যায্য ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশের মাধ্যমে। বোঝাতে হবে– নেতৃত্ব, আয়, স্বাধীনতা ও সম্মান পূর্ণকালীন সমান অংশগ্রহণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে; কর্মঘণ্টা কমিয়ে নয়।
সময়ের এই জটিল রাজনৈতিক মুহূর্তে নারীর জন্য সবচেয়ে জরুরি বার্তা– তাদের ভবিষ্যৎ, অধিকার ও স্বাধীনতা কোনো দলের রাজনৈতিক কৌশলের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। নারীর নিজের দাবি তারই উচ্চারণ করতে হবে। নারীবাদী সংগঠনগুলোর কাজ এই দাবিকে তথ্য, তত্ত্ব, গবেষণা ও সমানুভূতি দিয়ে শক্তিশালী করে তোলা। এখনই সময় নারীদের সংগঠিত করে বলা– নারীর জন্য প্রকৃত সুবিধা তার কর্মঘণ্টা কমিয়ে নয়; তার অধিকার ও মর্যাদা বাড়িয়ে।
ফারহানা হাফিজ ও সাবিনা
পারভীন: জেন্ডার বিশ্লেষক
- বিষয় :
- নারী অধিকার
