ভারত
ডিজিটাল আধিপত্য বনাম ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব
শশী থারুর
শশী থারুর
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বশক্তির টেকটোনিক প্লেটে রদবদল হয়েছে। তেলক্ষেত্র কিংবা সামুদ্রিক পথের ওপর নিয়ন্ত্রণই কেবল বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রাধান্যের প্রধান সূচক নয়; এখন তথ্যই নতুন মুদ্রা। ডিজিটাল উপস্থিতি একটি দেশের মূল সম্পদ এবং কূটনৈতিক হাতিয়ারও বটে। ভারতকে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির দেশ হিসেবে বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। আমাদের এখন ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের তিন সংকট মোকাবিলা করতে হবে: ডিজিটাল আধিপত্য, আত্মসমর্পণ, নাকি প্রকৃত ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব। আমাদের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি এবং জাতীয় মর্যাদা এখন এই ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক ডিজিটাল ব্যবস্থা মূলত আধিপত্য মডেলে নিয়ন্ত্রিত, যেখানে একচেটিয়াভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য রয়েছে। এই মডেলের বৈশিষ্ট্য হলো, বিশ্বের মৌলিক তথ্য, ডেটা ও আর্থিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। এই প্রযুক্তিগত আধিপত্যকে অস্ত্ররূপে ব্যবহারের বাস্তব নজির দেখা গেছে–ইরান ও রাশিয়াকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার পেছনে ছিল সুইফটের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন প্ল্যাটফর্মের ওপর নিয়ন্ত্রণ। পশ্চিমা বলয়ের বাইরে থাকা দেশগুলোর জন্য এই নিয়ন্ত্রণ ‘ড্যামোক্লিসের তরবারি’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যা সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং রাজনৈতিক আপসের দিকে ঠেলে দেয়।
ভারতও এই চাপ থেকে মুক্ত নয়। রাশিয়া থেকে সস্তায় অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের সক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। কারণ কোনো কোম্পানি সেই ঝুঁকি নিতে চায়নি। অনুরূপভাবে ডিজিটাল কর এবং ডিজিটাল বাণিজ্য বিষয়ে আমাদের আগেই ছাড় দিতে হয়েছে। পশ্চিমা চাপ এখানে স্পষ্ট। আধিপত্যকামী এই মডেল অন্যদের কাছ থেকে আনুগত্য দাবি করে এবং অন্যান্য দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বে গভীর, প্রায় অদৃশ্য হস্তক্ষেপ করে তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে।
প্রতিবেদনগুলো বলছে, মালয়েশিয়াও কিছু উদ্বেগজনক অঙ্গীকার করেছে। ডিজিটাল সেবা কর আরোপ না করা, যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল সেবার বিরুদ্ধে কোনো বৈষম্য না করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, উৎপাদন প্রক্রিয়া, সোর্স কোড বা ইত্যাদিতে নিজের অধিকার ত্যাগ করা। এসব কোনো নিছক প্রযুক্তিগত শর্ত নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের ডিজিটাল শিল্পনীতিকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলার আইনি ভিত্তি। এ ছাড়া মালয়েশিয়া এই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে যে তারা কোনো ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরামর্শ করবে, যদি সেই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে পারে। এটি কার্যত ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের আত্মসমর্পণ।
মর্যাদাবান ও আত্মনির্ভর ভারতকে অবশ্যই তৃতীয় পথটি দৃঢ়ভাবে বেছে নিতে হবে: ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব। এই মডেল এমন এক আইনগত ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলে, যা দেশের তথ্য রপ্তানি ও জাতীয় ডিজিটাল পরিসরে স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার নিশ্চিত করে। ভারত একটি গণতন্ত্র, চীনের মতো নয়; কিন্তু চীন যখন বিগ টেক কোম্পানিগুলোকে নিজেদের বাজার থেকে অনেকটাই দূরে রেখেছে, সে সিদ্ধান্তই আলিবাবা, টেনসেন্ট, ডিডির মতো বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি গড়ে তোলার উর্বর ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। সরকার নিয়ন্ত্রিত ক্রয় ও শিল্পনীতির মাধ্যমে চীন একটি সার্বভৌম কম্পিউটিং স্ট্যাক নির্মাণ করেছে। হার্ডওয়্যার থেকে শুরু করে ক্লাউড সার্ভিস পর্যন্ত সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল অর্থনীতিকে চালিত করছে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ বা সাত ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি।
এর বিপরীতে ভারতের সফটওয়্যার রপ্তানি আয় ২২৪ বিলিয়ন ডলার। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এই আয় দেশে উচ্চমূল্যের চাকরি, নিজস্ব ডেটা ক্যাপিটাল ও প্রোপাইটারি এআই বিকাশের প্রত্যাশিত প্রতিফলন নয়। আমাদের প্রতিভাবান সফটওয়্যার ও সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ইঞ্জিনিয়াররা বিশ্বব্যাপী ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছেন, কিন্তু তার সুফল ভারত পাচ্ছে না। বাণিজ্য চুক্তি অভিবাসন নীতির শিথিলতার জন্য আবেদন না করে, এই ডিজিটাল প্রতিভাকে আমাদের শক্তিশালী দরকষাকষির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত; যাতে আমাদের স্বার্থ নিশ্চিত হয়।
ভারতের আত্মনির্ভর ডিজিটাল পথ স্পষ্ট ও দৃঢ় হওয়া দরকার। আমাদের এমন এক ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে আমরা নিজস্ব ডিজিটাল জায়ান্ট তৈরি করতে পারি এবং নিজের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যে বিপুল সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে, তা দেশের ভেতরেই ধরে রাখতে পারি। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ডিজিটাল অর্থনীতি আগামী দিনে ট্রিলিয়ন ডলারের প্রবৃদ্ধি ও লাখ লাখ গুণগত চাকরি তৈরি করতে পারে, যা এআই-চালিত বেকারত্বের আশঙ্কার বিরুদ্ধে এক শক্ত ঢাল হিসেবেও কাজ করবে। বিকল্প একটাই। আমরা ডিজিটাল শক্তি হিসেবে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করব। তা না পারলে পরোক্ষভাবে এক নতুন ঔপনিবেশিক ডিজিটাল যুগে আত্মসমর্পণ করব।
শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- শশী থারুর
