ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

মুখচ্ছবি

মুখচ্ছবি
×

মো. বেলায়েত হোসেন

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাবার আপাতপক্ষে দেখে মনে হয় নির্দয়, কর্কশ, আবেগ ও অনুভূতিহীন এক প্রাণী। আবেগ বিনিময়ের সময় খুব বেশি পান না বলেই হয়তো এমন দৃশ্য। সন্তানদের জড়িয়ে ধরে ‘ভালোবাসি’ শব্দটি উচ্চারণের সংশয় মূলত পরিবারের ভার টানার যাতনা, যা নিখাদ রূঢ় বাস্তবতা। বাবার বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগের পত্র দিয়ে পৃথিবী ঢেকে ফেলা যায়। বাস্তবে তাই ঘটে থাকে। সহজেই সবাই সমান কাতারে এসে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে সর্বদা প্রস্তুত। তবুও বাবা জীবনতরী নিয়ে তীরে ভেড়ানোর স্বপ্নে অনড়। নির্ভীক সাহসী নাবিকের মতো অসীম গতিতে এগিয়ে চলেন। ওপারে নিয়ে যাওয়ার প্রবল প্রত্যয় বুকে। যদিও আসে শত বাধা-বিপত্তি। মাঝেমধ্যেই প্রবল শক্তির প্রচণ্ড আঘাতও মোকাবিলা করেন নিঃশব্দে; কখনও কাছের, আবার কখনও দূরের মানুষের দ্বারা। তবুও কোমল অভিমান দেখিয়ে সস্তা সহানুভূতির প্রত্যাশা থেকে শত সহস্র মাইল দূরে তাদের বসত। শত পীড়ন শক্ত করে বুকের ভেতর পুষে রাখেন। সহজে চোখ ভেজে না। অপ্রকাশিত শঠতা বাসা বাঁধে চোখে-মুখে ও হৃদয়ে।

মা-বাবা অধিকাংশ সময় জীবনের ভোগবিলাসকে জলাঞ্জলি দিয়ে সন্তানদের কূলে ফিরিয়ে প্রতিষ্ঠিত করায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, দরিদ্র পরিবারে এসব নিয়মিত ঘটনা। তাদের শত সহস্র ত্যাগ-তিতিক্ষাকে ক্ষুদ্র ভুল দিয়ে মূল্যায়নে ব্যস্ত পুরো পৃথিবী। মাইক্রোস্কোপিক পদ্ধতিতে দোষ খুঁজে বেড়ায়। অন্যরা কখনও বুঝতে চায় না যে, বাবা-মা আর সবার মতো মানুষ। নিজের ভেতর জমা হাজারো চাপা অভিমান। এক সময় অপ্রকাশিত অভিমানের সাগর নিয়ে ওপারে পাড়ি জমান। মৃত্যুর পরও অভিযোগের ডায়েরি থেকে নাম মুছতে পারেন না সন্তানরা। মাতৃগর্ভ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ একজন। বিভিন্ন ধর্ম অনুসারে মায়ের পরেই বাবার অবস্থান। বাবার আনুপস্থিতিতে মা অনেক জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পরিবারকে আগলে রাখেন। রীতিমতো সামাজিক রীতিনীতি মোকাবিলা করে সন্তানদের মানুষ করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। সফলও হন। অন্যদিকে স্বার্থপরতার দৃষ্টান্ত উজ্জ্বল করে সংকীর্ণতার পথ প্রশস্ত করতে ব্যস্ত আমরা।
সমাজে মা-বাবার প্রতি সন্তানের অমানবিক আচরণ প্রতিনিয়তই ঘটে। মানবিকতা আর নৈতিকতার পরাজয়ে রাক্ষসের উল্লাস চলে পথে-প্রান্তরে। বদলে যাওয়া পৃথিবীতে জন্মই যেন আজন্ম পাপ। 

একান্নবর্তী পরিবারগুলোতে বাবা-মা ছাড়াও দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা- চাচিসহ অন্যদের সঙ্গে অমৃত অটুট বন্ধনে প্রবল আবেশের শক্তিতে মোড়ানো ছিল। সুখের কেতন জানালায় পাহারায় বসত। তখনও হয়তো উপেক্ষা, নিগ্রহ ছিল। তবে তা পরম সৌহার্দ্য আর মমতাকে উপেক্ষা করার শক্তি ছিল না। এতে পারিবারিক, সামাজিক অনেক সমস্যাও মিটে যেত। ছেলেমেয়েদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বলতে গেলে শূন্যের কাছাকাছি ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একক পরিবার বনাম অনাদর, নিগ্রহ, নিষ্ঠুরতা সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মা-বাবা দুজনেই কর্মজীবী কিংবা ব্যস্ত অন্য কিছু নিয়ে। কখনও কখনও যথেষ্ট সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। ছেলেমেয়েরা এ সুযোগে মা-বাবার অনুপস্থিতিতে মোবাইল ইন্টারনেট বা আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারে খুবই ব্যস্ত। যান্ত্রিকতা বাসা বাঁধে শরীর ও মনে। এমন যান্ত্রিকতায় দয়া, সহানুভূতি, শ্রদ্ধা প্রত্যাশা করা নিন্তান্তই আশার গুড়ে বালি বৈ কি! শহর ও নগরজীবনে খেলাধুলার মাঠ সংকীর্ণ হওয়ায় শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে সন্তানরা।

আধুনিকতার উৎকর্ষে বৃদ্ধাশ্রমের কদর দিন দিন বাড়ছে। কেড়ে নিয়েছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। যে সময়ে নাতি-নাতনি নিয়ে গল্প করে সময় অতিবাহিত করার কথা;  বৃদ্ধাশ্রমের জানালা দিয়ে শুকনো ডালে বসা শালিক পাখির একাকিত্বের ডাক দেখে হাহাকারের রাজ্যে ঘুরে বেড়ানোর জনপ্রিয় গল্প অকৃত্রিম বাস্তবতা। সব বাবা-মায়ের প্রতি অহর্নিশ বিনম্র শ্রদ্ধা। 

মো. বেলায়েত হোসেন: তথ্য অফিসার, জেলা তথ্য অফিস, খাগড়াছড়ি 
[email protected]

আরও পড়ুন

×