মানবাধিকার
মানুষ পুড়িয়ে হত্যার ভয়ানক বার্তা
খুশী কবির
খুশী কবির
প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৯ | আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক কারখানার শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে যেভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। প্রথমে আমরা শুনতে পেলাম, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাঁর এ পরিণতি। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনুসন্ধান করে হত্যার ঘটনার কারণ হিসেবে ধর্ম অবমাননার প্রমাণ পায়নি। অতীতেও এ ধরনের ঘটনায় আমরা দেখেছি, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হলেও শেষ পর্যন্ত তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যাকে দুর্বল ভাবা হয়; যার কাছ থেকে পাল্টা প্রতিরোধের আশঙ্কা থাকে না, তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়। অবমাননার ঘটনা না ঘটলেও এ কথা বলে মানুষকে উস্কে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে অনেক সময় ভিন্ন স্বার্থও হাসিল করা হয়। শত্রুতার কারণে কিংবা জায়গাজমি দখল, হেয় করা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কারণে এমনটা করা হয়।
ভালুকার ঘটনায় আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, দিপু চন্দ্র দাস ছিলেন একজন শ্রমিক। তাঁর সঙ্গের লোকেরাই এমনটা করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে যেমনটা উঠে এসেছে, তাঁকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার পর উত্তেজিত জনতার কাছে তুলে দেন কারখানারই একজন। এরপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যার পর তাঁর মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। তার মানে, এখানে তাঁর বিরুদ্ধে গুজব রটানো হয়েছে। সবসময়ই এ ধরনের গুজব রটানো হয়। এরপর মব এসে তাদের কাছে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। এ ধরনের অভিযোগ উঠলেও কারখানা কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল ঘটনার সত্যতা যাচাই করা। মানুষ চাইল আর দিয়ে দিল– এ কেমন কথা! এখানে তারা দায় এড়াতে পারে না।
খুবই বেদনাদায়ক বিষয়, সম্মিলিত মব তাঁকে পিটিয়েছে, এর পর পুড়িয়েছে। এ ধরনের পরিবেশ সংগত কারণেই আমাদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। তাদের মধ্যে এত ক্ষোভ, এত সহিংস প্রতিক্রিয়া কেন? মানুষের এমন অমানবিক আচরণ খুবই উদ্বেগজনক। এটা ভয়ানক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এ ধরনের মব সহিংসতা আমরা আগেও দেখছি। দেশের নানা প্রান্তে যেসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তার কিছু কিছু আমাদের বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ করে তুলছে। এর মধ্যে নানা জায়গায় মব সন্ত্রাস এখনও চলছে এবং অনেক স্থানে পুলিশকে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকতে দেখা যায়। গত দেড় বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির জন্য অনেকাংশে দায়ী মব সহিংসতা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং দরগা-মাজার-বাউলদের ওপর হামলা-নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে মব।
চলতি বছরের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের পর থেকে পরবর্তী পাঁচ মাসেই সারাদেশের ৪০টি মাজারে ৪৪ বার হামলা চালানোর অভিযোগ পেয়েছিল পুলিশ। সেগুলোতে হামলায় ভাঙচুর, মাজারের সম্পত্তি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না।
ভালুকার ঘটনা সত্যিই ভয়ানক সতর্কসংকেত। রোববার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে স্পষ্ট, পরিকল্পিতভাবে দিপুকে ফাঁসানো হয়। সেখানে এসেছে, কারখানায় দুজন অধস্তন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে সুপারভাইজার দিপুর পদে বসার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু মেধায় দিপুকে টপকাতে না পেরে তারা দুই মাস ধরে তাঁকে চাকরি থেকে সরানোর ষড়যন্ত্র করছিলেন। এর আগে চক্রটি দিপুর বিরুদ্ধে নারী কর্মীকে যৌন হেনস্তার অভিযোগ তুলেছিল। তদন্তে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এরপর তারা ধর্মীয় অবমাননার অস্ত্র ব্যবহার করে।
এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানও তাঁর পক্ষে দাঁড়ায়নি। র্যাবের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তারা বলেছেন, ফ্লোর ইনচার্জ দিপুকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করেন। এরপর উত্তেজিত জনতার কাছে হস্তান্তর করেন তিনি। তাঁকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এমনকি তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। এই কারণে কারখানার সংশ্লিষ্ট দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ঘটনায় মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তারের খবর জানিয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, যখন ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি ছিল, সে সময় তারা কোথায় ছিলেন? যথাসময়ে তারা সক্রিয় হলে পুড়িয়ে ফেলার মতো এমন মানব অবমাননা কি সম্ভব হতো? এতটা ভয়ানক রূপ কি মানুষ দেখাতে পারত?
প্রায় একই সময়ে মানুষকে পুড়িয়ে ফেলার আরেক নৃশংস ঘটনা আমরা দেখেছি লক্ষ্মীপুরে। স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ঘরে গভীর রাতে যেভাবে তালা দিয়ে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, তার বীভৎসতা চিন্তা করাও কঠিন। ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর ৭ বছরের মেয়ের প্রাণহানি ঘটেছে। মেয়েটি বলছিল, ‘আব্বু বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও।’ শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি। মানুষ কতটা নির্দয় হলে এমনটা করতে পারে! এমন আচরণ যেন পশুকেও হার মানিয়েছে।

এসব হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে মানুষের জাগরণ জরুরি। আরও জরুরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতির অনেক ঘটনা আমরা দেখেছি। শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে হামলা ও আগুন, ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ। এগুলোর যে কোনো একটি ঘটনাই যেখানে অবিশ্বাস্য, সেখানে অঘটনগুলো একের পর এক ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যেই ভালুকা ও লক্ষ্মীপুরের দুটি ঘটনা। উভয় ক্ষেত্রেই মানুষকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটল। এমন ঘটনা মানুষকে ভীত করতে পারে। সে জন্য এ ধরনের অপতৎপরতা রুখে দিতে হবে। ধর্ম অবমাননার নামে কেউ যেন স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সে জন্য সজাগ থাকতে হবে।
এই অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না– ঘোষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতেই একটি মহল ষড়যন্ত্রমূলক বিভিন্ন স্থানে মব সহিংসতা ঘটাচ্ছে। এর সঙ্গে খোদ সরকারের একটি অংশের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন একজন স্বনামধন্য সম্পাদক নূরুল কবীর এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির ছাত্রনেতা ও বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এসব অভিযোগের যদি কিয়দংশও সত্য হয়, তাহলে বর্তমান সরকারকে একদিন না একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
কথা হচ্ছে, যে কোনো মূল্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে। সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে যে দেড় বছর সময় দেওয়া হয়েছে, সেটা কম নয়। তার ফলে আমরা কী কী সংস্কার পেয়েছি, তা তো দেখাই যাচ্ছে। বরং মব সহিংসতা বেড়েছে আড়ে-বহরে।
আমি মনে করি, নির্বাচন সামনে রেখে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য। আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণ যেন মসৃণ হয় সে জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের আস্থায় আনার ক্ষেত্রে মানুষ পোড়ানোর ঘটনা নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সে জন্য কঠোর হাতে এসব অপরাধ দমন করতে হবে এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।
খুশী কবির: মানবাধিকারকর্মী; সমন্বয়ক,
নিজেরা করি
- বিষয় :
- খুশী কবির
