সমকালীন প্রসঙ্গ
নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে নারীরা উপেক্ষিতই থেকে গেল!
খুশী কবির
খুশী কবির
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৮ | আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নারীদের আসন সংখ্যা। এরই মধ্যে আমরা নারী সংস্কার কমিশন থেকে প্রস্তাব জানিয়েছি। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনীতিবিদরা বহু বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন, বাস্তবতা মোটেও সন্তোষজনক নয়। ফলে আমাদের মধ্যে যারা এসব ব্যাপার নিয়ে ভাবি, স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হবো। পুরো পরিস্থিতি থেকে অন্তত এটা স্পষ্ট, নারী বিষয়টি সিরিয়াসলি নেওয়া হচ্ছে না এবং এই উপেক্ষার মনোভাব পুরো জাতির জন্য ক্ষতিকর।
আমরা দেখেছি বিপুলসংখ্যক নারী গণঅভ্যুত্থানে যোগ দিয়েছিল। তারা এভাবে স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে যোগ না দিলে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব ছিল না। অথচ আমরা দেখছি, নারীদের সেই অবদান যথাযথভাবে স্বীকার করা হয়নি। ফলে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমরা তৈরি করেছি, তাতে স্বাভাবিকভাবেই নারীরা অনাগ্রহী হয়ে উঠেছে। এই পরিণতি আমাদের নারীদের জন্য যেমন ক্ষতিকর, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর জাতিগত জায়গা থেকে। আমরা সামগ্রিক উন্নতি থেকে নিশ্চিতভাবে পিছিয়ে পড়ব। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, ১৯৭১ সালে আমরা যে জন্য জীবন দিয়েছি, তা বারবার হোঁচট খাচ্ছে।
সাধারণত আমাদের পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে নারীসমাজ সুবিধা করতে পারে না। একটা কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হয়। ফলে একটা জাতির অগ্রগতির জন্য যেসব বিষয়ে সামষ্টিক অগ্রযাত্রা দরকার, সে ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে পড়ে। এ জন্য কেবল পুরুষতান্ত্রিকতার দোষ দেওয়াও সঠিক পদ্ধতি নয়। নারীদের মধ্যেও পুরুষতান্ত্রিকতা বিরাজ করে। আবার নারী এ সমাজের বাইরের কেউ নয়। সমাজের বাস্তবতাও তার মধ্যে পড়া স্বাভাবিক। তবে দেশ-বিদেশে অনেক নারী এই বিদ্যমান ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছেন, যা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু অধিকাংশের মগজে পুরুষতান্ত্রিকতা রয়ে গেছে। নারীর স্থান, মর্যাদা, সুযোগ, স্থান অনেক কম ও দুর্বল। তারা যখন একটু জায়গা পায়, তারা মনে করে, অন্য কাউকে এখানে আসতে দেব না। এটা অনেক সময় পরিবারে হয়; আবার কর্মক্ষেত্রেও ঘটে। তাই বলা হয়, নারীই কখনও কখনও নারীর শত্রু হয়ে ওঠে।
পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চাইলে নারীকে ব্যবহার করা হয় অন্য নারীকে দমিয়ে রাখার জন্য। এখানে নারী নারীর শত্রু নয়। বরং পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারী বহু ক্ষেত্রে অসহায় ও দুর্বল। ফলে ইচ্ছা থাকলেও সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য অনেকাংশে নারীদের ভূমিকা নারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম, এই চিত্র পাল্টে যাবে। জুলাইয়ের বার্তাগুলো রাজনৈতিক মাঠে মূর্ত হয়ে উঠবে। এরই মধ্যে দেড় বছর কেটে গেল। তাতে আমরা যা পেয়েছি এবং দেখছি তা হতাশাজনক।
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ আরও সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ হওয়া জরুরি। কেবল ভোট দিয়ে নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আমরা অতীতে নারীদের ব্যাপারে বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, কিন্তু কখনও প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করিনি। ফলে সংরক্ষিত আসনের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে এটাও জরুরি, মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে আমরা নারীদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারছি কিনা, তা ভেবে দেখা। সংসদে নারীর জন্য ৫০ ভাগ প্রতিনিধিত্ব চাইতে আমরা ভয় পাই কেন? এ জন্য প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে চাপ দেওয়া উচিত।

আমরা এরই মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী-পুরুষ শিক্ষার্থী প্রায় সমান। যদি তা-ই হয়, তাহলে অন্তত অর্ধেক সংখ্যক নারীকে রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব করার কথা ছিল। ইতোমধ্যে যেসব প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোতে অন্তত নারীদের ব্যাপারে একটা গ্রহণযোগ্য সংখ্যা থাকা প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু সেটা পাইনি। কতজন পুরুষ প্রার্থী হয়েছে, নারীদের সংখ্যা কত, সেটি দেখলেই পুরো বাস্তবতা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। এখন জাতীয় নির্বাচনের চিত্রও তা থেকে আলাদা নয়, বরং আরও উদ্বেগজনক। যদি এভাবে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমতে থাকে, তাহলে নিকট ভবিষ্যতে আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের কণ্ঠস্বর হারাতে বসব।
রাজনৈতিক দলগুলো কি স্বেচ্ছায় নারীদের পিছিয়ে দিতে চাচ্ছে? পুরো বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ এ প্রশ্নই সামনে আসছে। যদি ব্যাপারটি যথেষ্ট সক্ষমতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারি, তাহলে সবারই বিপদ। নারীরা যেমন এই সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস করে, তেমনি নীতিনির্ধারকরা ও তাদের পরিবারও এই সমাজের অংশ। সুতরাং বিষয়টি কেবল নারীদের ব্যাপার বলে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাই উদার ও গণতান্ত্রিক সবাই মিলে একসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ তৈরি করতে হবে। একইভাবে রাজনীতিবিদদেরও ব্যাপারগুলো অনুধাবন করতে হবে, যদিও তাদের বেশির ভাগের মধ্যে আমরা সেই সদিচ্ছা দেখতে পাই না। একটা সামষ্টিক প্রচেষ্টা না থাকলে কোনো রাষ্ট্র কিংবা জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।
আমি আগেই বহুবার লিখেছি ও বলেছি, নির্বাচনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ও সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকলে তারা আরও ক্ষমতায়িত হবেন এবং সমাজের বৈষম্য কমে আসবে। সম্প্রতি আমরা নারীবিষয়ক যে সংস্কার কমিশন উপস্থাপন করেছি, তার মূল বার্তাও এটা– নারীদের প্রতিনিধিত্ব যেন বাড়ে। সে ব্যাপারে কেবল অন্তর্বর্তী সরকার এগিয়ে এলে বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও এগিয়ে আসার কথা বলেছি। কিন্তু বর্তমানের যে চিত্র, তাতে নারীদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে উদ্বেগজনক পরিস্থিতিই দেখছি।
দেশের এই বাস্তবতা বদলাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমাজ, সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের কার্যকর বোঝাপড়া তৈরি করতে না পারলে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো জোরালো হওয়া সম্ভব নয়। তাই অর্ধেক সংখ্যক নারী বাদ দিয়ে দেশ ও দশের উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আশা করি, রাজনৈতিক দল, নীতিনির্ধারক মহল, নাগরিক সমাজ ও নারীরা এ ব্যাপারে আরও আন্তরিক হবেন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গঠনে সোচ্চার থাকবেন।
নারীর মুক্তি মানে আমাদের সবার মুক্তি– এ কথা আমাদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে এবং সে অনুযায়ী বাস্তবায়নে তৎপর থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।
খুশী কবির: সমন্বয়ক, নিজেরা করি
- বিষয় :
- খুশী কবির
